দেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান বাড়ায় লোডশেডিংয়ের চাপ বেড়েছে, যা রাজধানীর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি অনুভূত হচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যে উত্তেজনা—জ্বালানি আমদানির সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। ফার্নেস তেল, কয়লা ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্নের কারণে দেশের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র সংকটে পড়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।
লোডশেডিংয়ের বর্তমান চিত্র
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। তবে বাস্তবে এর বড় একটি অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ১৮ এপ্রিল উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৫২ মেগাওয়াট। একই দিনে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াটে, আর উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর তথ্যে দেখা যায়, একদিনেই প্রায় ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৬০ মেগাওয়াট এবং ঢাকার বাইরে মোট ১১২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লোডশেডিং হয়েছে।
ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার এর তথ্য অনুযায়ী, দিনের বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ওঠানামা করেছে। ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত একাধিক সময়ে কয়েকশ থেকে হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা গেছে।
গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ
দেশের জাতীয় গ্রিড মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট; আর পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল গ্রিডে মোট ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই ৫৬১৮ মেগাওয়াট। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে মোট সরবরাহ ছিল ৪২৯৫ মেগাওয়াট, যা ঢাকার একক সরবরাহের তুলনায়ও কম।
গ্রামাঞ্চলে বেশি ভোগান্তি
রাজধানীর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি। অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি কৃষি কাজ ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় হলেও সামনে পরীক্ষা মৌসুম থাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট
বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি গ্যাসভিত্তিক এবং ৮টি তেলভিত্তিক কেন্দ্র। পাশাপাশি আরও ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর হওয়ায় জ্বালানির সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার বর্তমানে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ
সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারণ করলেও তা সব জায়গায় কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়ছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বড় ধরনের সংকট এড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে লোডশেডিং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি কঠিন হতে পারে।