দেশের কৃষি খাত বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সারের কৃত্রিম সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে জ্বালানি ঘাটতির কারণে সেচ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, এই দুই প্রধান সংকট কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত দিয়ে সার পাচার এবং বিপরীতে মাদক প্রবেশের ভয়াবহ চক্র, যা শুধু কৃষি খাত নয়, বরং দেশের সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কৃষি উৎপাদন, কৃষকের জীবনমান এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, সবকিছুই একসঙ্গে চাপে পড়েছে।
সরকারি পর্যায় থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা অভিযোগ করছেন, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিচ্ছেন, আর খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা বেশি আদায় করছেন। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহে প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সারের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। বাজারে সারের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, মজুতদারি এবং খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তারা কৃষকদের জিম্মি করে ফেলেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা, যাদের পুঁজি সীমিত এবং বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
সারের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঘটনা। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে নিয়মিতভাবে সার পাচারের অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ট্রাকভর্তি সার সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ছে। গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া এবং আশপাশের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নজরদারির ঘাটতি পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে টহল জোরদার ও অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে কৃষকের প্রাপ্য সার পাচার হয়ে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে, আর দেশের অভ্যন্তরে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট।
অন্যদিকে, এই পাচারের বিপরীতে দেশে ঢুকছে ভয়ংকর মাদকদ্রব্য, যা একটি নতুন সামাজিক সংকট সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের প্রধান রুট হিসেবে কক্সবাজার অঞ্চল ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ অঞ্চলে প্রায় ৮০ শতাংশ মাদক সাগরপথে প্রবেশ করে।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কক্সবাজার এলাকায় প্রায় ২৪ কোটি টাকার মাদক জব্দ করেছে। তবে এত অভিযান ও কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও মাদক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে চলা অভিযান সত্ত্বেও এই ব্যবসা কমেনি, এমন তথ্যও উঠে এসেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এই পরিস্থিতি শুধু কৃষির জন্য নয়, দেশের যুবসমাজের জন্যও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। কৃষি খাতের আরেকটি বড় সংকট হলো জ্বালানি ঘাটতি, যা সরাসরি সেচ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। ডিজেলের অভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে বোরো মৌসুমে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরিশাল, রাজশাহী, জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকের জমিতে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।
অনেক কৃষক ধারদেনা করে চাষাবাদ শুরু করলেও সেচের অভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের মধ্যে হতাশাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের খাদ্য উৎপাদনে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ সংকট মোকাবেলায় প্রশাসনিক তৎপরতা থাকলেও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। কৃষি মন্ত্রণালয় অভিযোগ পাওয়ার কথা বলছে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিল করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না।
পাচার, সিন্ডিকেট এবং জ্বালানি সংকট, এই তিনটি সমস্যার সমন্বিত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবস্থা নিলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। অতিরিক্ত দামে সার কেনা, জ্বালানি সংকটে সেচ বন্ধ থাকা, সব মিলিয়ে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অথচ ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তারা লাভ করতে পারছেন না। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে চাষাবাদ কমিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু কৃষি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় এর ওপর চাপ পড়লে অন্যান্য খাতেও তার প্রভাব পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- সারের বাজার কঠোরভাবে মনিটরিং করা এবং সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, সীমান্তে নজরদারি জোরদার করে পাচার বন্ধ করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষি খাত এখন এক ‘দ্বিমুখী সংকট’-এর মধ্যে রয়েছে, একদিকে উৎপাদন উপকরণের সংকট, অন্যদিকে সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ বাণিজ্য ও মাদক প্রবাহ। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু কৃষি নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠবে। তাই কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এখনই সময় বাস্তবমুখী, কঠোর এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই টিকে থাকবে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা।