ঈদকে ঘিরে যখন সারাদেশে কেনাকাটা ও লেনদেন বাড়ে, তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল টাকার কারবারিরা। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যেই চলছে তাদের প্রচারণা, এমনকি ক্রেতাদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘হোম ডেলিভারি’ সুবিধাও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, সারা বছর ধরে তৈরি করা জাল নোটের বড় একটি অংশ দুই ঈদকে কেন্দ্র করেই বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, বছরে উৎপাদিত জাল নোটের প্রায় ৭০ শতাংশই বিক্রি হয় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে। কারণ এ সময় বাজারে নগদ টাকার লেনদেন বেড়ে যায় এবং মানুষ ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় নোট ভালোভাবে যাচাই না করেই লেনদেন করে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্য বেচাকেনা : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল নোট বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিছু পেজ ও গ্রুপে সরাসরি পোস্ট দিয়ে ক্রেতাদের অর্ডার করতে বলা হচ্ছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, “উচ্চমানের প্রিন্ট করা জাল নোট” দেশের যেকোনো জায়গায় কুরিয়ার বা হোম ডেলিভারির মাধ্যমে পাঠানো হবে।
ফেসবুকে ‘জাল টাকার কারখানা’, ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘জাল টাকার ডিলার’, ‘জাল টাকা বিক্রি বাংলাদেশ ডট কম’সহ নানা নামে পেজের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া টেলিগ্রামেও ‘জাল টাকা সেল গ্রুপ’, ‘জাল টাকার লেনদেন’ নামের বিভিন্ন গ্রুপে এই অবৈধ বেচাকেনা চলছে বলে জানা গেছে।
একটি ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘আসসালামু আলাইকুম প্রিয় গ্রাহক। প্রথমবারের মতো উন্নতমানের প্রিন্ট করা নোট দেওয়া হচ্ছে। সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি। যারা নিতে চান, ইনবক্স করুন। ২০ থেকে ১০০০ টাকার সব ধরনের নোট পাওয়া যাবে।’ সেখানে আরও দাবি করা হয়েছে, অগ্রিম টাকা ছাড়াই শুধু ডেলিভারি চার্জ দিয়ে অর্ডার বুক করা যাবে।
ছোট নোটেও জালিয়াতির নতুন কৌশল : আগে সাধারণত ৫০০ ও ১ হাজার টাকার বড় নোট বেশি জাল করা হতো। কারণ এতে লাভের পরিমাণ বেশি। তবে এবার দেখা যাচ্ছে ১০, ২০, ৫০ বা ১০০ টাকার ছোট নোটও জাল করে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় নোট সাধারণত মানুষ ভালোভাবে দেখে গ্রহণ করে। কিন্তু ছোট নোট যাচাই না করেই অনেক সময় লেনদেন করা হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চক্রগুলো এখন ছোট মূল্যমানের জাল নোটও বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
কীভাবে তৈরি হয় জাল নোট : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, জাল নোট তৈরিতে উন্নতমানের ল্যাপটপ, প্রিন্টার, হিট মেশিন, বিশেষ স্ক্রিন, ডাইস এবং দামি কালি ব্যবহার করা হয়। টিস্যু পেপার বা বিশেষ কাগজে প্রিন্ট করার পর বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে টাকার জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও অনেকটা নকল করা হয়। এই কাজে চক্রগুলো গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারদেরও যুক্ত করে। তারা টাকার ডিজাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে এমনভাবে তৈরি করে যাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল আলাদা করা কঠিন হয়।
কম খরচে লাখ টাকার জাল নোট : অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০০ পিস ১ হাজার টাকার জাল নোট, অর্থাৎ এক লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল টাকা তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এরপর এই নোটগুলো পাইকারি ক্রেতার কাছে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। পাইকারি ক্রেতা সেগুলো আবার খুচরা ক্রেতার কাছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এরপর দ্বিতীয় স্তরের ক্রেতারা তা ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় অন্যদের কাছে বিক্রি করে। সবশেষে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা দোকান বা বাজারে নিত্যপণ্য কেনার মাধ্যমে এসব জাল নোট চালিয়ে দেয় এবং আসল টাকা হাতিয়ে নেয়।
কিছু ক্ষেত্রে এক লাখ টাকার জাল নোট মাত্র ১০ হাজার টাকায় পাওয়ার প্রলোভনও দেখানো হয়। সাধারণত প্রথমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে নোট পাঠিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়।
তিন ধাপে পরিচালিত চক্র : জাল টাকার এই চক্র সাধারণত তিনটি ধাপে কাজ করে। প্রথম ধাপে অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে সেই নোট ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তৃতীয় ধাপে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি বা দলের মাধ্যমে লেনদেনে ব্যবহার করা হয়।
মাদক ব্যবসা, চোরাই পণ্য কেনাবেচা কিংবা স্বর্ণের অবৈধ লেনদেনের সময়ও জাল নোট চালানোর ঘটনা ঘটে। দ্রুত লাভের আশায় অন্য পেশার অনেক মানুষও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
র্যাব-পুলিশের অভিযান ও নজরদারি : র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৩) সাম্প্রতিক একটি অভিযানে প্রায় ২৫ লাখ টাকার জাল টাকা এবং জালনোট তৈরির সরঞ্জামসহ দুই তরুণকে রাজধানীর তুরাগ থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের আগেই তারা বেশ কয়েক লাখ টাকার জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে।
র্যাব-৩ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া অফিসার) সনদ বড়ুয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, রোজা, ঈদ, পূজা বা বড় কোনো উৎসব সামনে এলেই জাল টাকার চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও অভিযান চলছে। ডিবিপ্রধান মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, উৎসবের সময় জাল টাকার প্রবণতা বাড়ে। তাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থানা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অনলাইনেও নজরদারি চলছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার অনেকেই নজরদারিতে রয়েছে।
জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধ : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জাল নোট তৈরির অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণত ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. জসিম উদ্দিন জানান, কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে জাল নোট তৈরির সঙ্গে জড়িত তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও অন্তত এক ডজন সদস্যের নাম পাওয়া গেছে, যারা এখন পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ঈদকে কেন্দ্র করে জাল টাকার বিস্তার ঠেকাতে অভিযান ও অনলাইন নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সচেতনতা ছাড়া এই জালিয়াতি পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন।