রোজায় দুশ্চিন্তা গ্যাস-বিদ্যুতে শঙ্কা তীব্র লোডশেডিংয়ের

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

জাতীয়

আর কদিন পরই রমজান। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এই সময়টায় দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা করা

2026-02-14T11:54:04+00:00
2026-02-14T11:54:04+00:00
  শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
রোজায় দুশ্চিন্তা গ্যাস-বিদ্যুতে শঙ্কা তীব্র লোডশেডিংয়ের
প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট ও বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম 
আর কদিন পরই রমজান। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুম। এই সময়টায় দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতায় পরিস্থিতি আরো জটিল করবে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদকরা একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা যাচ্ছে না। ব্যাংকঋণের সুদ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। 
অথচ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ধারা অনুযায়ী দীর্ঘস্থায়ী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা যায়। এদিকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এবারের রমজানে দেড় হাজার মেগাওয়াট থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। যা রমজানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সংকট থেকে সৃষ্ট উৎপাদন ব্যাঘাতের দায় উৎপাদকদের ওপর চাপানো চুক্তি ও আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশে গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া আগের উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়নি। এর ফলে সামনে আরো বড় গ্যাসসংকট দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়বে।’ অধ্যাপক তামিম সতর্ক করে বলেন, ‘বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না করা হলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাত এরই মধ্যে এর প্রভাব অনুভব করছে।’
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা। গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। জানা যায়, রমজান মাসে এবার গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে গ্রাহকদের ভুগতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। একদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে আমদানি করেও চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আবাসিকে অনেক গ্রাহক দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস পাচ্ছেন না। এরইমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এরই মধ্যে বলেছেন, রমজানে এলএনজিসহ কয়লা কেনার জন্য আর্থিক ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া কারিগরি প্রস্তুতি হিসেবে যে যন্ত্রপাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন সেগুলোর প্রস্তুতিও শেষ করেছি। রোজায় বিদ্যুৎ খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১২ শ এমএমসিএফডি গ্যাস দেওয়া হবে। রমজানে লোডশেডিং হবে কি না তা নির্ভর করবে এসি চালানোর ওপর। মানুষ বিদ্যুতের অপচয় না করলে আর লোডশেডিং হবে না। আর এ সময় লোডশেডিং হলেও আমরা শহর ও গ্রামে সমানভাবে লোডশেডিং দেব।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশ এলাকার আবাসিক ও শিল্পকারখানার গ্রাহকরা গ্যাসের সংকটে ভুগছেন। দিনের বেলা অধিকাংশ গ্রাহকের চুলায় গ্যাস থাকছে না। রান্নার কাজ সারতে রাতে বা গভীর রাতের জন্য মানুষকে অপেক্ষায় থাকতে হয়। বিকল্প হিসেবে অনেক গ্রাহক এখন এলপিজি, ইলেকট্রিক চুলা, মাটির চুলার মতো বিকল্প পদ্ধতিতে চলে যাচ্ছেন। এতে একদিকে জ্বালানির খরচ যেমন বেড়েছে তেমনি মাসে মাসে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পেয়েও গ্রাহকরা গ্যাসের বিল দিচ্ছেন।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, গত দুই বছর ধরে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের পাওনা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন শুরু হওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির বিভিন্ন পাওনাদারের কাছে বিপিডিবির বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যুৎ বোর্ডের বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে মোট বকেয়া প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধুমাত্র ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ১০,০০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কেন্দ্রগুলোর পাওনা ৬,০০০ কোটি টাকা। 
বিপিডিবি এক কর্মকর্তা জানান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব হলে আগামী গ্রীষ্মেও নজিরবিহীন লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। গত বছর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব হওয়ার কারণে তীব্র লোডশেডিং দেখা গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, দেশের বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা ১,২৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র গত গ্রীষ্মে কয়লা আমদানি না করতে পারার কারণে বন্ধ ছিল। যা দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে।
বর্তমানের চেয়ে বেশি পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, আসন্ন গ্রীষ্মে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাও কম। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হচ্ছে। যা সক্ষমতার কাছাকাছি বলে জানান পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা। বর্তমানে পেট্রোবাংলা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। যেখানে তাদের মোট চাহিদা ২৪২ কোটি ঘনফুট। গ্রীষ্মকালে পেট্রোবাংলা সার কারখানা ও অন্যান্য ভোক্তাদের গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে পারে, তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সরবরাহ সর্বোচ্চ ১২০ কোটি ঘনফুটের বেশি হবে না। এই পরিমাণ গ্যাস তাদের মোট চাহিদার মাত্র অর্ধেক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি ডেভিড হাসানাত বলেন, আমরা গত দেড় মাস ধরে বিপিডিবির কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে কোনো অর্থ পাইনি। বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকরা অর্থ সংকট ও ব্যাংকগুলোর অনুকূল ঋণপত্র (এলসি) সুবিধা না পাওয়ায় ফার্নেস অয়েল আমদানিতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি সরকারকে অনুরোধ জানান, অন্তত ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা দ্রুত পরিশোধ করতে, যাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকরা ফার্নেস অয়েল আমদানি করে রমজান মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন। এতে অন্তত এক মাসের জন্য ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: