যেকোনো মুহূর্তে পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এমন গুঞ্জন রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এর পাশাপাশি কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, তা নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। তবে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও সিনিয়র নেতাদের এই পদে প্রাধান্য দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এমনও আভাস পাওয়া গেছে।
এ ক্ষেত্রে আলোচনায় দলটির সিনিয়র তিন নেতা। তারা হলেন—বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খান। বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, উল্লিখিত তিন শীর্ষ নেতাই দলের পরীক্ষিত। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দলীয় নেতাদের বাইরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সচিবের নামও আলোচনায় আছে।
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় থাকা বিএনপির তিন সিনিয়র নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খানের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিবের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণকারী এই নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি অর্থনীতি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং কৃষি ও পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
অপরদিকে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রবাসে জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৬ সালের বিভিন্ন মেয়াদে একাধিক মন্ত্রণালয়ের (বিদ্যুৎ, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য) মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন। কুমিল্লা-২ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, ১৯৯৬ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
এ ছাড়া ড. আব্দুল মঈন খানও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। নরসিংদী-২ আসন থেকে একাধিকবার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বেশ সুপরিচিত। ১৯৯১ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী এবং ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য মনোনীত হন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, শারীরিক অসামর্থ্য বা অভিশংসন হলে এই পদ শূন্য হয়। এ ছাড়া গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের কারণেও রাষ্ট্রপতি অপসারিত হতে পারেন। আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। তখন অনেকে মনে করেছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে হয়তো দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে সরকারের পাঁচ মাস মেয়াদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি সরকার। সরকারপ্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানেই যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
জানা গেছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা ছিল রাষ্ট্রপতি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কি না। আর এখন বিষয়টি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। এ ছাড়া পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিএনপি থেকে কেউ হচ্ছেন, নাকি দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে—এমন আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বিএনপি তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সুযোগ পাবে।