বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এক নতুন বাঁক বদলের সন্ধিক্ষণ। তবে এবারের নির্বাচনে প্রথাগত প্রচারণার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল ময়দান। আর এই ময়দানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথাগত মাইকিং বা পোস্টারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ডিজিটাল কনটেন্ট। বর্তমানে আসনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এআইয়ের অপব্যবহার এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এটি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক চরিত্র হনন এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা বর্তমানে জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। যেমন আধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের অবিকল প্রতিচ্ছবি ও কণ্ঠস্বর তৈরি করে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি সেল থেকে এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের নামে ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে সেখানে এআই-জেনারেটেড বিকৃত ভিডিও ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক এডিটর কদরুদ্দিন শিশির বলেন, গুজব কিংবা অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়টি অলরেডি এলার্মিং হয়েই গেছে। ফেক নিউজ, মিসইনফরমেশন প্রতিনিয়ত মিডিয়া এবং মিডিয়ার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে ছড়াচ্ছে, এক রাজনৈতিক নেতা আরেক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ছড়াচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিডিয়া সেগুলোতে ইনভল্ভ হচ্ছে। এআই জেনারেটেড ছবির প্রসার ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে গেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে তত আরও বাড়ছে। এটি কতোটা খারাপ হতে পারে; সেটি আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। এসবের প্রভাব নির্বাচনের ওপর যাতে না পড়ে এর জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সূত্র জানায়, নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে এআই-এর এই ‘অদৃশ্য হামলা’ মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলো এখন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা ডিজিটাল প্রতিরক্ষা দেয়ালও শক্তিশালী করছে। বিএনপি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সাইবার সচেতনতা এবং ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে। তারা তাদের আইটি সেলের মাধ্যমে সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে যেন সামাজিক মাধ্যমে কোনো সেনসিটিভ ভিডিও দেখার সাথে সাথে তা শেয়ার না করে যাচাই করা হয়। তথ্যমতে, ফেসবুকে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে ছড়ানো দুই শর মতো ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। জাতীয় নির্বাচনের আগে ছড়ানো ভুয়া তথ্যগুলোর শিকার মূলত রাজনৈতিক দল ও নেতারাই হয়েছেন। একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে।
রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্ট ওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, বাংলা ফ্যাক্ট ও দ্য ডিসেন্ট এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত দিনে ১৯০টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তার মধ্যে ৯৩টি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে ২৯টি রয়েছে তারেক রহমানকে নিয়ে। তার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও ভুয়া তথ্যের শিকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, ডিজিটাইজেশন একদিকে দেশকে প্রগতিশীল করলেও অন্যদিকে বৈষম্য বাড়িয়েছে এবং এই বৈষম্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির চেয়ারম্যানের পর সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ভুয়া তথ্য।তারেক রহমানের বক্তব্য বিকৃত করে ও ভুয়া উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে মেয়ে জাইমা রহমানের বিয়ে প্রসঙ্গে তারেক রহমানের ভুয়া মন্তব্যের একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয় একটি সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমটি এমন কোনো ফটোকার্ডই প্রকাশ করেনি।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে ৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ফ্যাক্ট চেকিংয়ে। এর মধ্যে ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন’- এমন দাবিতে গণমাধ্যমের নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। ঢাকা–৮ আসনে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শুরু থেকেই বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে আসছেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে ৪টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে। ফেসবুকে কয়েকটি ছবিসহ দাবি করা হয়, তাঁর বাসা থেকে চার বস্তা টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, হাতকড়া পরা ছবিটি অন্য এক ব্যক্তির, যেখানে সম্পাদনা করে নাসীরুদ্দীনের মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত সপ্তাহে। গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন- এমন দাবিতে সংবাদমাধ্যমের একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে ফটোকার্ড তৈরির মাধ্যমে অনেক ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এসব বিষয় যাচাই ছাড়া শেয়ার করা উচিত নয়।’ বিএনপির আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে যারা পরাজিত হবে বা যারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়- তারা পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ভুয়া তথ্য ছড়াতে পারে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভুয়া এবং বিকৃত মন্তব্যের সবচেয়ে বড় শিকার হতে হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি)।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহার নিয়ে কার্যকর নীতিমালা না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘এআই-সংক্রান্ত পলিসি বা গাইডলাইন না থাকায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। সম্প্রতি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা হলেও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই।’ একইসঙ্গে এআই ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো চক্রগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।