আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিবেশ সুরক্ষা, নগর সৌন্দর্য রক্ষা এবং নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে এবার সব ধরনের পোস্টার, পামফ্লেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘পোস্টার রাজনীতি’ থেকে সরে এসে প্রচারণা স্থান করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে, ফেসবুক টাইমলাইন, টিকটক ভিডিও ও ইউটিউব স্ক্রিনে। ইসি প্রণীত নতুন আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল পোস্টার, পামফ্লেট কিংবা হ্যান্ডবিল ব্যবহার করতে পারবে না। কেবল নির্দিষ্ট মাপ, রঙ ও নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে, তাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে। অপরদিকে ডিজিটাল প্রচারণা সরাসরি মাঠে নয়, বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এসব বিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
#এআই প্রযুক্তি ও অপপ্রচারের ঝুঁকি
নির্বাচন কমিশনের মতে, অতীতে নির্বাচনী মৌসুম এলেই শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গা পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে যেত। এতে একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ত, অন্যদিকে নির্বাচন শেষে সেগুলো অপসারণ নিয়েও তৈরি হতো বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তি। নতুন এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রচারণাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় আনার লক্ষ্য নিয়েছে কমিশন।
নিয়ম আছে, বাস্তবতা কতটা? তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পুরোপুরি নিয়মের সঙ্গে মিলছে না। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোথাও কোথাও এখনও পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ড চোখে পড়ছে। প্রধান সড়ক, অলিগলি এমনকি বৈদ্যুতিক খুঁটিতেও কিছু প্রার্থীর প্রচারণামূলক সামগ্রী দেখা যাচ্ছে, যা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল।
নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের মতে, নিয়ম থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি সব জায়গায় সমান নয়, আবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। ফলে পোস্টার নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রিন্টিং ব্যবসায় মন্দা : এদিকে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রিন্টিং শিল্পে। রাজধানীর বাংলাবাজার, আরামবাগ ও নীলক্ষেত কেন্দ্রিক প্রিন্টিং ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় নির্বাচনী মৌসুম মানেই ছিল পোস্টার, লিফলেট আর ব্যানার ছাপানোর ব্যস্ততা। এবার সেই দৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ায় কাগজভিত্তিক প্রচারের বাজার কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক ছোট ছাপাখানা মালিক বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে যে অতিরিক্ত আয়ের আশা থাকত, এবার তা আর নেই।
পার্থীদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র সোশ্যাল মিডিয়া : পোস্টার নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় ফলাফল, নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু এখন সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব এবং এক্স (টুইটার) হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে তৈরি হচ্ছে শর্ট ভিডিও, রিলস, লাইভ স্ট্রিম, নির্বাচনী গান, থিম সং ও মিম।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৭৪ শতাংশ, যার বড় অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। ফলে তাদের কাছে পৌঁছাতে ৩০-৬০ সেকেন্ডের টিকটক ভিডিও কিংবা ফেসবুক রিলসেই তুলে ধরা হচ্ছে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক বার্তা। কোনো কোনো দল আবার জনপ্রিয় অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করছে নিজেদের ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দিতে।
এআই প্রযুক্তি ও অপপ্রচারের ঝুঁকি : ডিজিটাল প্রচারণার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকিও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও ও বিভ্রান্তিকর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষক ইমরান হোসেন বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া অল্প সময়ে বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ, বিভাজন ও সহিংসতাও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিওই পুরো ক্যাম্পেইন ভেঙে দিতে সক্ষম।
ইসি’র জন্য বড় পরীক্ষা : ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সামনে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। অপপ্রচার, গুজব ও এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট ঠেকানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ভুয়া ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, পোস্টারবিহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রচারণার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাগজের দেয়াল থেকে প্রচারণা সরে যাচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। এখানে জয়ী হতে হলে শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, সৃজনশীল ডিজিটাল কনটেন্ট ও নৈতিক প্রচারণা। আর মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, পোস্টার না থাকলেও প্রচারণা থেমে নেই। বরং এবার ভোটের মাঠ আরও বেশি সরব ফেসবুক টাইমলাইন আর টিকটকের শর্ট ভিডিওতে।