বাংলাদেশে গ্যাস সংকট কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে চলতি সময়ে এই সংকট এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, যা শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কার্যত অচল করে দিচ্ছে। কোথাও কারখানার চিমনি নিভে যাচ্ছে, কোথাও সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, আবার কোথাও রান্নার চুলা জ্বালাতে মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যয়বহুল এলপিজির ওপর। সংকটের পেছনে শুধু সরবরাহ ঘাটতি নয়, অব্যবস্থাপনা, সিস্টেম লস, গ্যাস চুরি এবং সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের মুনাফালোভ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
চুরি ও সিস্টেম লসে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার অপচয়॥ পেট্রোবাংলার নীতিমালা অনুযায়ী, গ্যাস বিতরণে অনুমোদিত সিস্টেম লসের হার সর্বোচ্চ ২ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিস্টেম লস ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। অবৈধ সংযোগ, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে বা অপচয় হচ্ছে।
#চুরি ও সিস্টেম লসে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার অপচয়
#শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত, ঝুঁকিতে রপ্তানি
#পরিবহন খাতে চরম দুর্ভোগ
#এলপিজির দামে আগুন, চাপে সাধারণ মানুষ-ছোট ব্যবসারা
#সংকটের পেছনে এলপিজি আমদানির জটিলতা
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এই অব্যবস্থাপনার ফলে প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ গ্যাস কার্যত নষ্ট হচ্ছে। গ্যাসের সংকট যখন চরমে, তখন এই অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিয়ে। শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত, ঝুঁকিতে রপ্তানি॥ গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গীসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও আংশিক কিংবা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার একাধিকবার শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
পরিবহন খাতে চরম দুর্ভোগ॥ ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি এখন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক স্টেশন নির্ধারিত সময়ের আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে পরিবহন খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এলপিজির দামে আগুন, চাপে সাধারণ মানুষ-ছোট ব্যবসারা॥ পাইপলাইনের গ্যাস না পেয়ে গৃহস্থালি ও ছোট ব্যবসাগুলো এখন নির্ভরশীল এলপিজির ওপর। কিন্তু এই সংকটকে পুঁজি করে এলপিজির বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা। বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, কোথাও ২ হাজার, কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ছোট খাবারের দোকানগুলোতে রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের মার্জিন কমছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সংকটের পেছনে এলপিজি আমদানির জটিলতা॥ এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ ( লোয়াব) জানিয়েছে, শীতকালে বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, জাহাজ সংকট এবং আর্থিক জটিলতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানি কমেছে। দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করলেও কার্যত ছয়টি বড় কোম্পানি বাজারের বেশির ভাগ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান থেকে আমদানি করা এলপিজি বাজারে প্রবেশ করতে না পারায় সংকট আরও বেড়েছে। যদিও জ্বালানি বিভাগ দাবি করছে, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং খুচরা পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও বিতর্ক॥ সংকট মোকাবিলায় সরকার এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট কমানো, এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বাজার তদারকি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। জেলা-উপজেলা প্রশাসনকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশজুড়ে ভোগান্তির চিত্র॥ ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কোথাও দোকান বন্ধ, কোথাও গোপনে বেশি দামে বিক্রি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে লাকড়ি বা ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছে।
সমাধান কোথায়? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু আমদানি বাড়ানো নয়। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ, সিস্টেম লস কমানো, পাইপলাইন আধুনিকায়ন এবং এলপিজি বাজারে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এর ভার বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গ্যাস সংকট এখন আর কেবল জ্বালানি সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি, শিল্প ও জনজীবনের গভীর সংকট। অব্যবস্থাপনা ও লোভের রাজনীতি বন্ধ না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।