দিশেহারা মানুষ, বাড়ছে উদ্বেগ-অসন্তোষ

সুজন দে

জাতীয়

নিত্যপণ্যের চড়া দাম, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব

2026-11-04T15:40:10+00:00
2026-11-04T15:43:56+00:00
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
দিশেহারা মানুষ, বাড়ছে উদ্বেগ-অসন্তোষ
নিত্যপণ্যের চড়া দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা ব্যয়ে নাভিশ্বাস
সুজন দে
বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৪০ পিএম  আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ৩:৪৩ পিএম
প্রতীকী ছবি
নিত্যপণ্যের চড়া দাম, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য না কিনেই ফিরতে হচ্ছে অনেককে। কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ঋণ করছেন, আবার কেউ খাবার ও চিকিৎসার খরচ কমিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি  নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বেসরকারি চাকরিজীবী, দিনমজুর ও অসংগঠিত খাতের শ্রমিকদের আয় বাড়বে কীভাবে? জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অসন্তোষ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সেপ্টেম্বরের হিসাবে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যের পাশাপাশি বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ব্যয়ের চাপও প্রকট। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয় না হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে সীমিত আয়ের মানুষের।

এর মধ্যে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সংসারের বাজেটে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নভেম্বরের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। অক্টোবরে ছিল ১ হাজার ৮৩৭ এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। মাত্র দুই মাসে বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। অথচ নির্ধারিত দামেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী হাসান শামীম ভোরের ডাককে বলেন, ‘গত মাসে একটি সিলিন্ডার কিনেছি ২ হাজার ৪০০ টাকায়। অথচ সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এখন দাম আরও বাড়ল। আড়াই হাজার টাকার বেশি দিতে হবে কি না, সেই চিন্তায় আছি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামানও এলপিজির দাম দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ আদায় ভোক্তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়াচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

গত দুদিনের রাজধানীর কয়েকটি বাজারে ক্রেতাদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম ও শাকসবজির দাম নিয়ে তাদের অসন্তোষ কাটছে না। বাজারভেদে দামের পার্থক্য এবং সরবরাহের ওঠানামায় মাসিক বাজেট ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অভিভাবকেরা।

খিলগাঁও রেল গেইটে ভোরের ডাকের সাথে কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাজিম আহমেদের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে  ভোরের ডাককে বলেন,‘বাজারে ঢুকলেই মনে হয় টাকার কোনো দাম নেই। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার হতো, এখন তা দিয়ে কয়েক দিনের বাজারও হয় না। দাম বাড়লে সবাই নানা ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু আমাদের আয় বাড়ানোর কথা কেউ বলে না। সাধারণ মানুষ আর কত সহ্য করবে?

পুরানা পল্টন মোড়ে কথা হয় রিকশাচালক মহিউদ্দিনের সঙ্গে।তিনি বলেন, সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে ঘরভাড়া আর বাজারের খরচই ওঠে না। মাছ-মাংস কেনা তো দূরের কথা, অনেক দিন ডিমও কিনতে পারি না। বাচ্চারা ভালো কিছু খেতে চাইলে দিতে পারি না। গরিব মানুষের বাঁচার উপায় কী?

সরকারি বেতন বাড়লো, বেসরকারি খাতের কী হবে : সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও ভাতা বৃদ্ধি হলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একই ধরনের নিশ্চয়তা নেই। অথচ বাজারে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী সবাইকে একই দামে পণ্য কিনতে হয়।

এ ব্যাপারে একটি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক ভোরের ডাককে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে  ভালো কথা। কিন্তু আমরা কোথায় যাব? আমাদেরও পরিবার আছে, সন্তান আছে। বাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ—সবকিছুর দাম বাড়ছে। সরকার কি বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ানোর বিষয়েও কোনো উদ্যোগ নেবে?

গত অক্টোবরে প্রকাশিত একটি জরিপে দেশের প্রায় অর্ধেক পরিবার ঋণগ্রস্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। উৎপাদকের কাছ থেকে কম দামে কেনা পণ্য খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে শুধু মূল্যস্ফীতি কমানোই যথেষ্ট নয়, মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।

সাধারণ মানুষের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে কার্যকর উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে? সরকারি বেতন বৃদ্ধির আলোচনার পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমানোর পথই বা কী? এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত সমাধান না মিললে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও অসন্তোষ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: