বাংলা চলচ্চিত্রে একসময় তাঁর ছিল একচ্ছত্র জনপ্রিয়তা। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকের বাড়তি আগ্রহ। একের পর এক ব্যবসাসফল ও দর্শকপ্রিয় সিনেমা, অভিনয়ের স্বীকৃতিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সব মিলিয়ে শাবানা ছিলেন ঢালিউডের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। অথচ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ ক্যামেরার সামনে থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। ছেড়ে দেন দীর্ঘদিনের প্রিয় পেশা, পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল না চলচ্চিত্রের প্রতি অভিমান কিংবা দর্শকের ভালোবাসা হারানোর ভয়; ছিল মা হিসেবে সন্তানদের পাশে থাকার গভীর তাগিদ।
চিত্রনায়িকা শাবানার আসল নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। মাত্র আট বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু তাঁর। ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত উর্দু ছবি ‘চকোরী’তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর কয়েক দশক ধরে অভিনয় করেছেন নানা ধরনের চরিত্রে। নায়িকা থেকে ভাবি, মা—সব ভূমিকাতেই নিজের অভিনয়দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। অভিনয়জীবনে কাজ করেছেন ২৯৯টি সিনেমায়। এর মধ্যে আলমগীরের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন ১৩০টি ছবিতে। পেয়েছেন ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও আজীবন সম্মাননা।
সন্তানদের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত
খ্যাতি, ব্যস্ততা, দর্শকের ভালোবাসা—সবকিছু পেছনে ফেলে অভিনয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু একটা সময় শাবানা উপলব্ধি করেন, দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নিজের জন্য যেমন সময় পাননি, তেমনি সন্তানদেরও যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তাঁদের পাশে থাকার প্রয়োজন আরও গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় শাবানা জানিয়েছেন, বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান। তখন সন্তানদের বয়স কম। তাঁরা মাকে খুব মিস করছিলেন। দেশে থাকলে কাজের ফাঁকে সন্তানদের দেখতে পারতেন, কিন্তু দূরত্ব বাড়ার পর সেই সুযোগ আর ছিল না।
শাবানার ভাষায়, ‘সন্তানদের যদি ঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আমার এই অভিনয়জীবন দিয়ে কী হবে!’ মা হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকেই কষ্ট করে হলেও সিনেমা ছেড়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে মনোযোগী হন তিনি।
২৯৯ সিনেমার ক্যারিয়ার, আলমগীরের সঙ্গে ১৩০ ছবিতে
শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু করে শাবানা হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। রাজ্জাক, আলমগীর, নাদিম, ফারুক, জসীম ও সোহেল রানার মতো জনপ্রিয় অভিনেতাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য সিনেমা। ‘ভাত দে’, ‘অবুঝ মন’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘সত্য মিথ্যা’, ‘রাঙা ভাবী’, ‘ওরা এগারো জন’, ‘মাটির ঘর’ ও ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’সহ তাঁর অভিনীত বহু ছবি আজও দর্শকের স্মৃতিতে জায়গা করে আছে।
তাঁর বাবা ফয়েজ চৌধুরীও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুরুতে মেয়েকে অভিনয়ে দিতে রাজি না হলেও পরে তিনিই হয়ে ওঠেন শাবানার অন্যতম অনুপ্রেরণা। বাবার পরিচালিত ‘মুক্তি’, ‘মালকাবানু’, ‘বিজয়িনী সোনাভান’, ‘আলতাবানু’ ও ‘রাজার মেয়ে বেদিনী’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি।
স্বামীর সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাস
সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শাবানার অভিনয় ছাড়ার সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেন তাঁর স্বামী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক ওয়াহিদ সাদিক। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার সুযোগ থাকায় পরিবারের সঙ্গে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। অভিনয়জগতের ব্যস্ততা ছেড়ে নতুন জীবনে মনোযোগ দেন শাবানা।
সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, চলচ্চিত্রের সহশিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে তাঁর গড়ে উঠেছিল পারিবারিক সম্পর্ক। শাবানা নিজেই চলচ্চিত্রজগৎকে নিজের আরেকটি পরিবারের মতো মনে করতেন। সবাইকে মিস করলেও জীবনের প্রয়োজনেই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করেন তিনি।
সন্তানদের সাফল্যেই তৃপ্তি
সন্তানদের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তার সুন্দর পরিণতিও দেখেছেন শাবানা। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ শেষ করে সংসারী হয়েছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা তাঁর জীবনের বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি।
আর কি ফিরবেন অভিনয়ে?
বিভিন্ন সময়ে শাবানার অভিনয়ে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম রোকেয়ার জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে—এমন কথাও শোনা গিয়েছিল। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা নেই তাঁর।
২০২৪ সালে গণমাধ্যকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাবানা বলেছিলেন, ‘এখন পরিবারটাই আমার জগৎ।’ তাঁর সময় কাটে সন্তান, নাতি-নাতনি ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। মাঝেমধ্যে নাতি-নাতনিরা ইউটিউবে তাঁর অভিনীত সিনেমা দেখে নানা প্রশ্ন করে। তখন পুরোনো দিনের স্মৃতি ভাগ করে নেন তিনি।
একসময় যাঁর দিন কাটত শুটিংয়ের আলো-ক্যামেরার সামনে, সেই শাবানার জীবনের কেন্দ্র এখন পরিবার। দর্শকের ভালোবাসা, অসংখ্য সিনেমার স্মৃতি আর অর্জনের দীর্ঘ তালিকা পেছনে রেখে তিনি বেছে নিয়েছেন সন্তানদের পাশে থাকার জীবন। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও দর্শকের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান যে এখনো অমলিন, পুরোনো সিনেমার জনপ্রিয়তাই তার প্রমাণ।