আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ প্রয়োজনে ক্রসফায়ারে যেতে পারে—পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা পুলিশের পেশাদারত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার সম্ভাবনা তুলে ধরা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামানের মতে, পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে উপস্থাপন করা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং তা পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচায়ক।
তিনি বলেন, আইজিপি একদিকে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, অন্যদিকে সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন। এ দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কোনো সরকারের অনুমতিই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না।
বিবৃতিতে অতীতের বিভিন্ন আলোচিত ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, সিনহা হত্যা মামলা, টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, পুলিশপ্রধানের এমন বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে কর্মকর্তার দায়িত্ব পুরো বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তাঁর মুখে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনার কথা বাহিনীর নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
বিবৃতিতে সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। টিআইবির উল্লেখ অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই অপরাধ দমন সম্ভব। এমন অবস্থানের পরও আইজিপি কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের প্রসঙ্গ তুলেছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। এ সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগের প্রসঙ্গেও উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিবৃতির শেষাংশে টিআইবি আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।