মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি: প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার অমর সুরসাধক

ধর্ম

বিশ্বমানবতার কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭–১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩ খ্রি.) বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময় এবং সুফি দর্শনের প্রোজ্জ্বল

2026-09-29T19:48:03+00:00
2026-09-29T19:48:03+00:00
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ধর্ম
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি: প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার অমর সুরসাধক
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বমানবতার কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭–১৭ ডিসেম্বর ১২৭৩ খ্রি.) বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময় এবং সুফি দর্শনের প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র। আট শতাব্দীরও বেশি সময় আগে বর্তমান আফগানিস্তানের বালখ শহরে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তিনি কেবল একটি যুগ বা অঞ্চলের পরিধিকেই আলোড়িত করেননি; বরং কালের সীমানা পেরিয়ে আজকের অতি আধুনিক, প্রযুক্তিশাসিত এবং আত্মিক সংকটে ভোগা মানুষের হৃদয়েও এক পরম আশ্রয় হয়ে উঠেছেন। তিনি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা সুফি কবি, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আজকের পৃথিবী যখন যুদ্ধ, হিংসা, বস্তুবাদ ও আত্মিক শূন্যতার এক চরম গোলকধাঁধায় পথ হারাচ্ছে, তখন রুমির বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘তোমার হৃদয়ে যে আলো আছে, তা দিয়েই তুমি তোমার পথ খুঁজে পাবে।’ তাঁর জন্মবার্ষিকী কেবল একটি ঐতিহাসিক পঞ্জিকার তারিখ উদ্‌যাপন নয়; এটি আসলে মানুষের ভেতরের শাশ্বত প্রেম, মানবিকতা ও ঐশ্বরিক সত্যের অনুসন্ধানের এক মহান পুনর্জাগরণ।

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের (বর্তমান আফগানিস্তান) বালখ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১২১৯ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর পরিবার জন্মভূমি ছেড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে বর্তমান তুরস্কের কোনিয়া শহরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। রুমি ছিলেন তৎকালীন প্রথাগত ইসলামী শাস্ত্র, আইন ও দর্শনের একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত। শত শত অনুসারী তাঁর বক্তৃতায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতেন।

তাঁর জীবনের আসল মোড় ঘুরে যায় ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দের এক অপরাহ্ণে। সে সময় তুরস্কের কোনিয়ার এক জনাকীর্ণ বাজারে রুমির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় রহস্যময় এক পরিব্রাজক সুফি সাধক শামস-ই-তাবরিজির। প্রচলিত ও জনপ্রিয় রূপক কাহিনি অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ পণ্ডিত ও শিক্ষক রুমি তখন ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তাঁর চারপাশে ছিল ভক্ত-শিষ্যদের ভিড় এবং মূল্যবান কিতাব বা বইয়ের স্তূপ। পরিব্রাজক দরবেশ শামস তাবরিজি হঠাৎ রুমির পথ রোধ করেন এবং ইশারায় বা সরাসরি তাঁর বইগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করেন, ‘এগুলো কী?’

পণ্ডিতসুলভ অহংকার ও কিছুটা বিরক্তি নিয়ে রুমি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এগুলো এমন জ্ঞান, যা তোমার বোধগম্য নয়।’ এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই শামস রুমির বইগুলো পাশের একটি পুকুরে বা চৌবাচ্চায় ফেলে দেন। রুমি আঁতকে ওঠেন এবং ব্যথিত হয়ে তাঁর সারা জীবনের সাধনার অমূল্য গ্রন্থগুলো রক্ষার জন্য চিৎকার করে ওঠেন। রুমি যখন পানি থেকে বইগুলো তোলেন, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখেন, বইগুলোর একটি পাতাও ভিজে যায়নি কিংবা সামান্য ক্ষতিও হয়নি।

বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রুমি শামসকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এসব কী?’ শামস তখন মৃদু হেসে উত্তর দেন, ‘এটি এমন কিছু, যা তুমি বুঝতে পারো না। যা অর্জন করা বইয়ের পাতার কাজ নয়, অনুভবের বিষয়। জ্ঞান বইয়ে থাকে না, জ্ঞান থাকে অন্তরে।’ এই উপদেশ ও আকস্মিক রহস্যময় ধাক্কা রুমির ভেতরের অহংকার এবং প্রথাগত পণ্ডিতের আবরণ ভেঙে চুরমার করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, বাহ্যিক জ্ঞান বা বুদ্ধির চেয়ে অন্তরের প্রেম ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি অনেক বেশি গভীর। এই সাক্ষাতের পর রুমি তাঁর শিক্ষকতা ও প্রথাগত জীবন ছেড়ে শামস তাবরিজির হাত ধরে এক অনন্ত প্রেমের আধ্যাত্মিক অভিযাত্রায় শামিল হন।

বিরহের আগুন ও মেভলেভি তরিকার জন্ম

শামসের এই অলৌকিক আধ্যাত্মিক স্পর্শ রুমিকে এতটাই বদলে দিয়েছিল যে তিনি দীর্ঘ কয়েক মাস একটি নির্জন কক্ষে শামসের সঙ্গে ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। বাহ্যিক পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও ঈর্ষান্বিত কিছু শিষ্য শামসের এই প্রভাব মেনে নিতে পারেননি। ফলে একদিন রহস্যজনকভাবে শামস কোনিয়া থেকে নিখোঁজ হয়ে যান।

মুর্শিদের এই অন্তর্ধান রুমিকে এক চরম বিরহের সাগরে নিক্ষেপ করে। এই বিরহের আগুনই রুমিকে সাধক কবিতে রূপান্তরিত করেছিল। তিনি কোনিয়ার রাস্তায় রাস্তায় শামসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন। লোকগাথা অনুযায়ী, একদিন কোনিয়ার এক স্বর্ণকারের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হাতুড়ি দিয়ে সোনা পেটানোর নির্দিষ্ট ছন্দময় আওয়াজ (ঠক-ঠক) শুনে রুমির আত্মা পরম আনন্দে নেচে ওঠে। তিনি রাস্তার মাঝখানেই দুই হাত প্রসারিত করে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করেন।

এই বিরহ ও আনন্দের অলৌকিক মেলবন্ধন থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত সুফি নৃত্য ‘সামা’ এবং সৃষ্টি হয় দেওয়ান-ই-শামসের অমর কবিতাগুলো। রুমি বুঝতে পেরেছিলেন, শামস আসলে তাঁর বাইরে কোথাও হারিয়ে যাননি; বরং তাঁর নিজের হৃদয়ের মাঝেই মিশে গেছেন।

শামসের সংস্পর্শে এসে প্রথাগত পণ্ডিত রুমি রূপান্তরিত হন এক পরম প্রেমিক, ব্যাকুল সুফি কবিতে। কিতাবের শুকনো পৃষ্ঠা ছেড়ে রুমি ডুব দিলেন হৃদয়ের অতল সমুদ্রের মুক্তো কুড়াতে। শামসের অন্তর্ধানের পর যে বিরহবেদনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকেই জন্ম নেয় রুমির অমর সব সৃষ্টি। রুমি নিজেই তাঁর এই রূপান্তরকে ব্যক্ত করেছেন এভাবে—

মৃত ছিলাম, জীবিত হলাম,

কাঁদতে ছিলাম, হেসে উঠলাম।

প্রেমের সাম্রাজ্য এলো, আর আমি হয়ে উঠলাম

শাশ্বত এক সুলতান।

ফারসি ভাষায় রচিত রুমির সাহিত্যিক কীর্তি কেবল সুফিবাদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তা বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় স্থান করে নিয়েছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি হলো ‘মসনবি-ই-মানাবি’। ছয় খণ্ডে বিভক্ত প্রায় ছাব্বিশ হাজার চরণের এই মহাকাব্যকে বলা হয় সুফিবাদের বিশ্বকোষ বা ‘ফারসি ভাষার কোরআন’। বাঁশির সুরে সুর মিলিয়ে মসনবির প্রথম চরণটি শুরু হয় মানুষের চিরন্তন আধ্যাত্মিক বিরহের আর্তি দিয়ে—

শোনো এই বাঁশির গান, কীভাবে সে তার বিচ্ছেদের গল্প বলছে,

যবে থেকে আমাকে বাঁশঝাড় থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে,

তখন থেকে আমার ক্রন্দনে পুরুষ ও নারী সমভাবে অশ্রুপাত করেছে।

এখানে বাঁশি হলো মানুষের আত্মা, যা তার মূল উৎস (সৃষ্টিকর্তা) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই মর্ত্যে কাঁদছে। মসনবি ছাড়াও রুমি রচনা করেছেন ‘দিওয়ান-ই-শামস তাবরিজি’, যা তাঁর গুরু শামসের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত গীতিকবিতার এক অনন্য সংকলন। তাঁর প্রতিটি কবিতায় ছন্দ ও সুরের যে ঝংকার, তা পাঠককে এক অলৌকিক আনন্দের জগতে নিয়ে যায়।

মাওলানা রুমির দর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘এশ্ক’ বা স্বর্গীয় প্রেম। তাঁর মতে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে প্রেমের টানে এবং প্রেমই একে টিকিয়ে রেখেছে। তিনি সৃষ্টিকর্তাকে কোনো দূরবর্তী কঠোর বিচারক হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন পরম ‘প্রিয়তম’ হিসেবে। রুমি বিশ্বাস করতেন, আচারসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মনকে সমস্ত অহংকার, হিংসা ও লৌকিকতা থেকে মুক্ত করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। তিনি মানুষের সংকীর্ণ জাতপাত ও ধর্মীয় বিভাজনের দেয়াল চূর্ণ করে বলেছিলেন—

‘আমার অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নয়, আমি স্থানাতীত;

আমি কোনো সুনির্দিষ্ট শরীরের বাঁধনে নেই, আমি আত্মিক;

আমি নিজেকে উৎসর্গ করেছি প্রিয়তমের চরণে,

সব দ্বৈততা আমি মুছে ফেলেছি।’

রুমির এই সর্বজনীন মানবিক আবেদনই তাঁকে আজ পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে আমেরিকা ও ইউরোপে, সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পঠিত কবিদের একজন করে তুলেছে। আধুনিক মানুষ যখন যান্ত্রিক জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট, তখন রুমির কবিতা তাদের আত্মায় শান্তির প্রলেপ লাগায়।

মাওলানা রুমির দর্শনের আরেকটি জীবন্ত রূপ হলো ‘সামা’ বা ঘূর্ণন নৃত্য, যা মেভলেভি সুফি তরিকার মূল প্রতীক। এই নৃত্যে সুফিরা এক হাত আকাশের দিকে (সৃষ্টিকর্তার করুণা গ্রহণের প্রতীক) এবং অন্য হাত মাটির দিকে (সেই করুণা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার প্রতীক) রেখে এক পায়ে ভর করে বৃত্তাকারে ঘোরেন।

এই ঘূর্ণন আসলে মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণনের এক পার্থিব প্রতিচ্ছবি। রুমি বিশ্বাস করতেন, যখন শব্দের গভীরতা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, তখন শরীর আর স্থির থাকতে পারে না। এই নৃত্যের মাধ্যমে সাধক নিজের অহংবোধ বিসর্জন দিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান।

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে রুমির দর্শন কেন এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আজ আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং মহাকাশ জয়ের যুগে বাস করছি, ঠিক তখনই মানুষের মানসিক হতাশা, যুদ্ধবিগ্রহ ও একাকিত্বও প্রকট হয়ে উঠেছে। রুমি আমাদের শেখান কীভাবে অন্তরের দিকে তাকাতে হয়। তিনি বলেন—

‘গতকাল আমি চতুর ছিলাম, তাই পৃথিবীকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম।

আজ আমি জ্ঞানী, তাই নিজেকে পরিবর্তন করছি।’

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই ক্রান্তিকালে রুমির সহনশীলতা, ক্ষমা ও পরমতসহিষ্ণুতার বাণী অত্যন্ত জরুরি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রচার করেননি; বরং মানুষের হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন।

তুরস্কের কোনিয়ার সবুজ গম্বুজের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহান সাধক। তাঁর সমাধিসৌধের দরজায় লেখা রয়েছে তাঁর নামে প্রচলিত সেই অমর বাণী, যা আজও পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে আলিঙ্গন করে। বাণীটি হলো—

এসো, এসো, তুমি যেই হও না কেন, এসো,

তুমি যদি কাফের হও, মূর্তিপূজক হও বা অগ্নি-উপাসক হও, তবুও এসো!

আমাদের এই কাফেলা নিরাশার কাফেলা নয়;

তুমি যদি শতবারও তোমার তওবা ভেঙে থাকো, তবুও এসো।

লেখক: সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


Loading...
Loading...

ধর্ম- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: