ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্র। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারীরা এগিয়ে। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ১৮৪ জনের। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই মারা গেছেন ৮৭ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে এ মাসে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের ঘরের বাইরে বেশি চলাচল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে মশার কামড়ের ঝুঁকি এবং জনসংখ্যায় তরুণদের বেশি অংশগ্রহণের কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হতে পারে। অন্যদিকে নারীদের চিকিৎসা নিতে দেরি, গর্ভাবস্থা, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে দুজন করে এবং ঢাকা ও বরিশাল বিভাগে একজন করে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৮৪ জন ঢাকা বিভাগে। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ২৯২, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭১, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৭, বরিশালে ১৫৪, রাজশাহীতে ১৩৭, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৩২, ময়মনসিংহে ৮২, রংপুরে ৬৫ এবং সিলেটে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ জনে। সেপ্টেম্বরে মাত্র ২০ দিনেই প্রাণহানি হয়েছে ৮৭ জনের। এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক ৮৭ জন মারা গেছেন। খুলনায় ৩৪, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে ১৮ জন করে, বরিশালে ১৪, রাজশাহীতে আট, রংপুরে চার এবং সিলেটে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৮ হাজার ৪৬৫ এবং নারী ২২ হাজার ৯৭৩ জন। তবে এ সময়ে মারা যাওয়া ১৮৪ জনের মধ্যে নারী ৯৫ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫২ শতাংশ; পুরুষ ৮৮ জন বা ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ আক্রান্তের হিসাবে পুরুষ বেশি হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারী এগিয়ে। ১৯ সেপ্টেম্বর এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ২৩২ জনের মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৭৮৯ এবং নারী ৪৪৩ জন। ওই দিন মারা যাওয়া দুজনই পুরুষ। পরদিনের ছয় মৃত্যুসহ মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪ জনে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ১৬-২০ বছর বয়সী ৮ হাজার ২২৪, ২১-২৫ বছর বয়সী ৮ হাজার ৭৫১, ২৬-৩০ বছর বয়সী ৮ হাজার ৬৩১ এবং ৩১-৩৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৯৬৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ এই চার বয়সসীমা মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৩১ হাজার ৫৭২। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এই বয়সীদের উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। ১৬-২০ বছর বয়সীদের মধ্যে সাতজন, ২১-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৪, ২৬-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৩ এবং ৩১-৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৭ জন মারা গেছেন। ৩৬-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ৫ হাজার ৩৩৩ জন এবং মৃত্যু ১৯ জন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের চলাচল ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ডেঙ্গুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাত ও পরীক্ষার আওতায় আসার প্রবণতাও আক্রান্তের পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, দেশের জনসংখ্যায় তরুণদের অংশ বেশি হওয়ায় আক্রান্তের সংখ্যাতেও তাদের অংশ বেশি হতে পারে। পাশাপাশি তরুণেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, কর্মস্থলসহ বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেন। ফলে এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকি বাড়ে। তার মতে, ঘরের বাইরে বেশি চলাচল এবং বিভিন্ন স্থানে মশক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে যারা ঘরে থাকেন, তাদের চলাচল তুলনামূলক কম হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কম হতে পারে। তবে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নারী-পুরুষের জীবনযাত্রাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নারীদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে চিকিৎসা নিতে দেরি করাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, পরিবারের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নারীদের সীমাবদ্ধতা থাকলে অনেকেই গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। গর্ভাবস্থা, রক্তক্ষরণ, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য সহাবস্থায়ী শারীরিক সমস্যা ডেঙ্গুর জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই হাসপাতালে ভর্তির শুরুতেই নারী রোগীর গর্ভাবস্থা ও রক্তক্ষরণের তথ্য নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রসূতি ও মেডিসিন বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে; বিশেষ করে নারী, গর্ভবতী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করা যাবে না। একই সঙ্গে বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও কর্মস্থলে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা নয়, মশক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন।