তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির চাহিদা বাড়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, বছরের শেষ দিকে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর স্থায়িত্বের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। এর প্রভাব বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কী মাত্রায় পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত না হলেও বোরো চাষসহ কৃষি, পানি ও জনস্বাস্থ্যে বাড়তি ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে বোরো ধান। দেশের সবচেয়ে বেশি ধান আবাদ হয় মূলত শুষ্ক মৌসুমে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রোপণ করা বোরো ধান এপ্রিল-মে মাসে কাটা হয়। এ সময় বৃষ্টির ওপর নির্ভরতা কম থাকায় সেচের পানির প্রয়োজন হয় বেশি। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে জমির পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। ফলে সেচের প্রয়োজন আরও বাড়বে।
জলবায়ুবিজ্ঞানী রাশেদ চৌধুরী বলেছেন, ২০২৬ সালের এল নিনো অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী এবং এটি ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শুধু এল নিনোর উপস্থিতি দেখেই বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে কতটা বৃষ্টি হবে বা কতটা খরা দেখা দেবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এল নিনোর ধরন, সময় এবং ভারত মহাসাগরের অন্যান্য আবহাওয়াগত অবস্থার ওপর বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে।
বাংলাদেশের অতীত আবহাওয়ার তথ্যেও এর ভিন্ন প্রভাবের নজির রয়েছে। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক এল নিনোর কয়েকটি ঘটনায় বাংলাদেশে শুষ্কতা ও খরার প্রবণতা দেখা গেছে। আবার কেন্দ্রীয় প্রশান্ত মহাসাগরকেন্দ্রিক কিছু ঘটনায় বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে এবারের এল নিনোর প্রভাবও একই রকম হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। জুলাই ও আগস্টের শুরুতে সমুদ্রের নিচের কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। এই অতিরিক্ত উষ্ণ পানি এল নিনোর শক্তি আরও বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন, খরা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও সতর্ক করেছে, শক্তিশালী এল নিনো কৃষি, পানি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে কৃষিতে। অতিরিক্ত তাপের কারণে ধানের ফুল ফোটা ও দানা গঠনের সময় ক্ষতি হলে ফলন কমতে পারে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত কমে গেলে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব ঝুঁকি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে; নির্দিষ্ট ক্ষতির পূর্বাভাস দিতে স্থানীয় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এল নিনোকে দুর্যোগে পরিণত হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কৃষিতে আগাম আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার, অঞ্চলভেদে বোরো রোপণের সময় নির্ধারণ, স্বল্পমেয়াদি ও তাপসহনশীল ধানের জাত ব্যবহার এবং সেচ ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও সম্ভাব্য অতিরিক্ত তাপ ও পানির চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত রাখতে হবে।
এল নিনো শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর। তবে এর শক্তি ও স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস যেভাবে সতর্ক করছে, তাতে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।