নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস আবারও মনে করিয়ে দিল—প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের সামর্থ্য কতটা সীমিত। ২৬ আগস্টের আকস্মিক দুর্যোগে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়েছে জনপদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, সেতু ও ঘরবাড়ি। প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ, নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে।
একজন মুসলমানের কাছে এমন দুর্যোগ শুধু আতঙ্ক বা শোকের কারণ নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নিজের দায়িত্ব নতুন করে উপলব্ধি করারও সুযোগ। ইসলাম যেমন তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেয়, তেমনি বিপদ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলে। নেপালের এই বিপর্যয় তাই মুসলিমদের জন্যও রেখে গেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা।
নেপালের দুর্যোগের চিত্র
গত ২৬ আগস্ট নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আকস্মিক স্রোত ও পাহাড়ধসে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু মানুষ হতাহত ও নিখোঁজ হন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভ্রমণকারীরাও ছিলেন।
প্রকৃতির এই তাণ্ডব আবারও দেখিয়ে দিল, প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতায় মানুষ যতই এগিয়ে যাক, প্রকৃতির শক্তির সামনে তার সক্ষমতা সীমিত।
বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা
নেপালের এই দুর্যোগ শুধু একটি দূরদেশের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশে বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন, উপকূলে জলোচ্ছ্বাস, পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ধস এবং রাজধানী ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এখন পরিচিত চিত্র।
এর পাশাপাশি তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ ও খরার মতো দুর্যোগও মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির কথাও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। এমন কোনো দুর্যোগ আঘাত হানলে শুধু অবকাঠামোর দুর্বলতাই নয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ড অনেক সময় এর ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী দখল, পাহাড় কাটা, জলাধার ভরাট ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ড প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ফলে অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের মতো প্রাকৃতিক ঘটনাও কখনো ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নেয়। নেপালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য তাই পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
দুর্যোগকে কীভাবে দেখবে একজন মুসলমান?
দুর্যোগের পর সাধারণত দুটি বিপরীত ধরনের বক্তব্য সামনে আসে। কেউ একে কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কোনো দুর্যোগ ঘটলেই সেটিকে আল্লাহর গজব বলে ঘোষণা করেন। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এ দুই চরম অবস্থানের কোনোটিকেই সরলভাবে সমর্থন করে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম: ৪১)
এই আয়াত মানুষকে নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মসমালোচনা করার শিক্ষা দেয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধস বা ঝড়কে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর শাস্তি বা গজব হিসেবে ঘোষণা করার অধিকার মানুষের নেই। অতীতের যেসব জাতির ওপর বিশেষ শাস্তি নেমে এসেছিল, সেসব বিষয়ে নবীদের ওহির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল। নবী-রাসুলদের পর ওহির সেই ধারা শেষ হয়েছে।
তাই কোনো দুর্যোগকে নিশ্চিত ‘গজব’ বলে প্রচার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ধর্মীয় শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একে কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবেও দেখাও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি নয়।
বরং দুর্যোগ মানুষের অহংকার ভেঙে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি এবং সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে। একজন মুমিনের জন্য এই উপলব্ধি আতঙ্কের বদলে দায়িত্ববোধ ও আত্মসংশোধনের পথ তৈরি করা উচিত।
তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি প্রস্তুতি
ইসলাম মানুষকে শুধু দোয়া করতে শেখায় না; বিপদ মোকাবিলায় বাস্তব প্রস্তুতি নেওয়ার শিক্ষাও দেয়। নবীজি (সা.) আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
এক ব্যক্তি উট ছেড়ে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বললে নবীজি (সা.) তাকে আগে উট বেঁধে রাখতে এবং এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলেন। (সুনান আত-তিরমিজি)
দুর্যোগ মোকাবিলায় এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগাম সতর্কতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত করা, উদ্ধার পরিকল্পনা, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানুষের প্রশিক্ষণ—এসব আল্লাহর ওপর ভরসার বিপরীত নয়। বরং দায়িত্বশীলভাবে প্রস্তুতি নেওয়াই তাওয়াক্কুলের বাস্তব প্রকাশ।
দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো
দুর্যোগের সময় শুধু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। শিশু, নারী, প্রবীণ, অসুস্থ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। বিপদের সময় মানুষের হাত ধরার শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে।
একটি দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সহযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং পারস্পরিক সহমর্মিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের দুর্যোগ থেকে শিক্ষা
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস মুসলিমদের জন্য একদিকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে নিজেদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ সীমিত—এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা একই। পাহাড় কাটা, নদী দখল, জলাধার ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধের পাশাপাশি দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ বসতি, কার্যকর আগাম সতর্কতা, আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
প্রকৃতির আঘাত সবসময় ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর একজন মুসলমানের জন্য সেই প্রস্তুতির সঙ্গে থাকতে হবে তাওয়াক্কুল, আত্মসমালোচনা ও রবের প্রতি ফিরে আসার চেতনা।