আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) ১২ রবিউল আউয়াল। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এ দিনটি বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি পালিত হচ্ছে।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশে হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন এবং ছয় বছর বয়সে তিনি মা আমিনাকেও হারান। এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয় ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয় এবং তিনি নবুয়ত লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি মানুষকে তাওহিদ, ন্যায়, শান্তি, সাম্য, সহনশীলতা ও মানবতার পথে আহ্বান জানান। মক্কার অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’-এর সমাজে তিনি সত্য ও ন্যায়ের আলো জ্বালিয়ে দেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। ক্ষমা, দয়া, সহমর্মিতা, পরোপকার, ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ও কর্ম সর্বকালের মানুষের জন্য অনন্য শিক্ষা হয়ে আছে। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি এক মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত: ৪)।
এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-কে ‘সমগ্র জগতের জন্য রহমত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর জীবনকে মুমিনদের জন্য ‘উত্তম আদর্শ’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, দোয়া ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। মুসল্লিরা মহানবী (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশের পাশাপাশি দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে শুরু হয়েছে পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচি। এর আওতায় মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা, সেমিনার, কিরাত মাহফিল, হামদ-নাত, কবিতা পাঠ, ইসলামি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, ৫৬টি ইসলামিক মিশন এবং আটটি ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতেও ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
ঢাকায় জশনে জুলুস ও বিভিন্ন আয়োজন
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ঢাকায়ও রয়েছে নানা কর্মসূচি। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল ১০টায় আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভান্ডারীয়ার উদ্যোগে জশনে জুলুস ও মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা, ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেবেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠনও দিনটি উপলক্ষে পৃথক কর্মসূচি নিয়েছে। বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও এর বিভিন্ন সংগঠন ‘সিরাতুন্নবী (সা.)’ শিরোনামে মাসব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ে ‘মেহফিলে ইশক রাসুল (সা.)’ ও নাত-সন্ধ্যার আয়োজন করেছে।
বায়তুল মোকাররমে মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলা
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে। এতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে এবং প্রায় দুই শতাধিক স্টল থাকবে।
এ ছাড়া রাজধানীর স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। কিরাত, আজান, হামদ-নাত, রচনা, কবিতা, উপস্থিত বক্তৃতা ও আরবি খুতবা লিখনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ছুটি
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। এ উপলক্ষে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনও বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা হিংসা-বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়েই এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে।