শুল্কের চাপে ব্যাহত হচ্ছে মাছ আমদানি-রপ্তানি

সুমন হাওলাদার

বাণিজ্য

উচ্চ শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণে জটিলতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে দেশের মাছ ও মৎস্যপণ্য আমদানি-রপ্তানি

2026-07-26T12:59:46+00:00
2026-07-26T12:59:46+00:00
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
বাণিজ্য
নীতিগত সংস্কারের তাগিদ
শুল্কের চাপে ব্যাহত হচ্ছে মাছ আমদানি-রপ্তানি
সুমন হাওলাদার
রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
উচ্চ শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণে জটিলতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে দেশের মাছ ও মৎস্যপণ্য আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চাপে পড়েছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামাল, প্যাকেজিং উপকরণ ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ করভার উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক কম খরচে পণ্য সরবরাহ করায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা পিছিয়ে পড়ছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি পর্যায়ে উচ্চ শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণে অতিরিক্ত খরচ, ডলারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মৎস্য বাণিজ্য চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নীতিগত সংস্কার না হলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এ খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মৎস্য খাতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার। শুল্ক কাঠামো সহজ করা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার বাড়ানো, কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নত করা, বন্দর ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি মূল্য সংযোজিত পণ্য (রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট) পণ্য উৎপাদন বাড়াতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। 

এছাড়া শুল্কনীতি, রপ্তানি নীতি, অবকাঠামো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম এ খাত আগামী বছরগুলোতে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদও রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি কমাতে হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭৭ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রায় ৬,১৪৪.৯১ কোটি টাকা (৬ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। 

এ সময়ে মোট ৯০.৬২ হাজার থেকে ৯১ হাজার মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের মাছ ও মৎস্যপণ্য বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, চীনসহ ৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও সবচেয়ে বড় বাজার।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে মাছ ও মৎস্যপণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি প্রত্যাশিত গতিতে বাড়েনি। একই সময়ে দেশের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রতি বছর ভারত, মিয়ানমার, নরওয়ে, ভিয়েতনাম ও চীন থেকে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ, স্যামন, টুনা, মাছের পোনা, ফিশমিল এবং প্রক্রিয়াজাত মৎস্যপণ্য আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম কর এবং অন্যান্য করের কারণে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মোট করভার এত বেশি হয় যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে ব্যবসার ব্যয় কমানো, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেছেন, এলডিসি-উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তাই এখন থেকেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্য কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়ায়ও রপ্তানি বাড়াতে দূতাবাসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মান, ট্রেসেবিলিটি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত পূরণে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাঁচামাল আমদানিতে বেশি শুল্ক দিতে হলেও প্রতিযোগী দেশ ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইকুয়েডরে রপ্তানিমুখী শিল্পকে তুলনামূলক বেশি নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে সেসব দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর। তবে এলডিসি-উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে গেলে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তাই এখনই নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়ার বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) সাবেক সভাপতি আমিন উল্লাহ বলেন, উৎসে কর কমানো এবং রপ্তানি সহায়তা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হবে।

তিনি আরো বলেন, শুধু শুল্ক নয়, বন্দরে কনটেইনার জট, বিদ্যুতের ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদও রপ্তানির ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঁচা চিংড়ির সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বিকল্প হিমায়িত খাদ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে, যাতে অবকাঠামো ও শ্রমশক্তি ব্যবহার অব্যাহত রাখা যায়।

মৎস্য খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত চিংড়ি ও মাছের গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত। কিন্তু উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাদের মতে, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক যৌক্তিক করা হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানি আয় বাড়বে।

বেনাপোল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ট্রাকের ওজনের পরিবর্তে চাকার সংখ্যার ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের কারণে আগেই মাছ আমদানি কমেছিল। এখন নতুন বাজেটে শুল্ক আরও বাড়ানোয় আমদানিকারকদের বড় অংশ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এ খাতে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে যেতে পারে।

কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে বেনাপোল কাস্টমস। বাজেট ঘোষণার পরদিন থেকেই নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়েছে। এর ফলে মিঠা পানির মাছ আমদানিতে আগে যেখানে প্রতি কেজিতে ৮৬ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক দিতে হতো, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৩১ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি প্রায় ৪৬ টাকা বেশি শুল্ক গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। 

অন্যদিকে সামুদ্রিক মাছ ও রুই মাছের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে শুল্ক ৪৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ এসব মাছেও কেজিপ্রতি প্রায় ২৪ টাকা অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য নিয়ন্ত্রণ ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, বাজেট ঘোষণার আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক মাছ বন্দরে প্রবেশ করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি আরও কমে গেলে এই ঘাটতি আরও বাড়বে।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: