অপ্রতিরোধ্য স্পেন দেশজুড়ে উৎসব

সফিকুল হাসান সোহেল

খেলা

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর পুরো স্পেনজুড়ে বইছে উল্লাসের ঢেউ। আর দলটির তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের শৈশব

2026-07-21T12:41:05+00:00
2026-07-21T12:41:05+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
খেলা
অপ্রতিরোধ্য স্পেন দেশজুড়ে উৎসব
সফিকুল হাসান সোহেল
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর পুরো স্পেনজুড়ে বইছে উল্লাসের ঢেউ। আর দলটির তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের শৈশব কেটেছে যেখানে, সেই রোকাফোন্দা যেন পরিণত হয়েছে উৎসবের একটি কেন্দ্রে। কেউ গায়ে জড়িয়েছেন জাতীয় পতাকা, কেউ আবার হাতে উড়িয়ে বেড়াচ্ছেন সেটি। অনেকের গায়ে জাতীয় দলের জার্সি। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে এমন উৎসবই তো স্বাভাবিক। 

বার্লিনে দুই বছর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিনের মুকুট পরেছিল স্পেন। গতকাল রোববার নিউজার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো লা রোজারা। ২০১০ সালে তারা একই কীর্তি গড়েছিল, ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর। স্পেনের সবশেষ সাফল্য পুরুষ ও নারী ফুটবলে তাদের অবিস্মরণীয় আধিপত্য ধরে রাখল। তারা প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হলো। ২০২৩ সালে সিডনিতে নারী বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। 

নিউইয়র্কে স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল দিয়ে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে ১-০ গোলে জিতে উল্লাসে মেতেছে স্প্যানিশরা। ব্যবধান গড়ে দেওয়া গোলটি করেছেন ফেররান তরেস। 

২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতা স্পেন, ১৬ বছর পর আবারও হলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপ জুড়েই দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন ইয়ামাল। দুই বছর আগে ইউরো জেতা স্প্যানিশ সেনসেশন এবার পেয়ে গেলেন বিশ্ব জয়ের স্বাদও! তাতে সবচেয়ে বেশি খুশি যেন তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার জনপদ রোকাফোন্দা।

বার্সেলোনা থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তরে মাতারোয়ের উপকূলীয় শহর রোকাফোন্দা। যেখানে বসবাস করেন শ্রমজীবী ও বহু-সংস্কৃতির মানুষ। যাদেরকে চেনা হয় ৩০৪ সংখ্যাটা দিয়ে। এটা শুধুই একটা সংখ্যা নয়, এটা রোকাফোন্দার পোস্টাল কোড। যার পুরোটা ০৮৩০৪। বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটাও তো সত্যি, কখনও কখনও মানুষের নাম থাকে না; পরিচয়পত্র হয়ে ওঠে সংখ্যা, যেমন ক্রীতদাস, কিংবা কয়েদী নম্বর। 

হরহামেশাই মানুষ যেমন নাক সিঁটকে বলে ‘অমুক অঞ্চলের লোক’, বিষয়টা যে তেমনি। ইয়ামালও সেই গোত্রের, যাদের সে অর্থে নাম নেই কিংবা নামহীন; অঞ্চল দিয়ে চেনা হয় যাদের! এখন অবশ্য গল্পটা বদলেছে অনেক। বলা ভালো, বদলে দিয়েছেন ইয়ামাল। স্পেনের হতদরিদ্র জনপদ রোকাফোন্দাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছেন তিনি। 

স্পেনের যে অঞ্চলে বেড়ে ওঠার পরিচয় দিতে মানুষ কুণ্ঠাবোধ করে, আড়ষ্ট থাকে। সেটাকেই সবার সামনে উঁচিয়ে ধরছেন এই ফরোয়ার্ড। মরক্কান বাবা ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মায়ের ঘরে স্পেনে জন্ম নেওয়া ইয়ামাল নিজের পরিচয়ের প্রতি সবসময়ই গর্ব প্রকাশ করেছেন। গোল করার পর তার বিখ্যাত ‘৩০৪’ আঙুলের ইশারা সেই ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। 

এবারের বিশ্বকাপেই যেমন, রোকাফোন্দা লেখা একটি হেডব্যান্ড পরেছেন ইয়ামাল। বুটে ধারণ করেছেন বাবা-মায়ের জন্মভূমির পতাকা এবং বারবার বলেছেন, ফুটবল বর্ণ ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

ছয় বছর বয়সে বার্সেলোনার একাডেমি লা মাজিয়ায় যোগ দেন ইয়ামাল। এখন তিনি কাতালান ক্লাবটি তো বটেই, স্পেনেরই সবচেয়ে বড় তারকা। তিনি যেমন শেকড় কখনো ভোলেন না, রোকাফোন্দার মানুষও তাকে নিজেদেরই একজন মনে করে এখনও। যে কমিউনিটির মাঠে ছোটবেলায় নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন ইয়ামাল, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে তার বিশাল দেয়ালচিত্র। স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং স্বপ্নপূরণের প্রতীক।

স্পেনের জয় রোকাফোন্দায় বয়ে যাচ্ছেন আনন্দের জোয়ার। বিশেষ করে, ইয়ামালকে ঘিরেই তাদের উল্লাসটা বেশি। তাদেরকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে যাচ্ছেন যে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ। শুধু রোকাফোন্দায় নয়, রাজধানী মাদ্রিদেও নেমে আসে উৎসবের ঢেউ। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন। স্পেনজুড়ে শুরু হয় আনন্দের বিস্ফোরণ। শহর থেকে শহরে- সবখানেই দেখা যায় বিজয়োৎসবের রঙিন দৃশ্য। লাল-সোনালি পতাকায় মোড়া সমর্থকেরা নেচে-গানে মাতিয়ে রাখেন চারপাশ। একসঙ্গে গলা মিলিয়ে বলেন চ্যাম্পিয়ন! চ্যাম্পিয়ন!

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আমরাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! আমাদের জাতীয় দল ছিল দুর্দান্ত। ধন্যবাদ, স্পেন! বার্সেলোনাতেও ছিল একই উন্মাদনা। ইয়ামালসহ এবারের বিশ্বকাপে স্পেন দলের অনেক খেলোয়াড়ই এই ক্লাবটির। শহরটিতে আতশবাজির ঝলকানিতে আলোকিত হয়ে ওঠে রাতের আকাশ।  

ওখানেই শেষ নয়। তাদের পুরুষ দল ২০২৩ সালে নেশন্স লিগ জিতেছিল, ২০২৪ সালের অলিম্পিকসও। আর ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় নেশন্স লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় নারী দল। সাফল্যের পরিসংখ্যান আরও অবিশ্বাস্য। গত পাঁচ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায়ে এনিয়ে ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান শিরোপা জিতল তারা। 

স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গুইলেম বালাগ বিবিসি স্পোর্ট-কে বলেন, এটা আধিপত্য। এটা যেন এক নিখুঁত ঝড়। সাংস্কৃতিকভাবে আমরা নির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করি। সবাই এটায় বিশ্বাস করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা যেন থেমে না যাই। এটা আরেকটা এভারেস্ট কারণ পুরুষ দল ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল। এখন আমরা আবার এটা করলাম। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের পেলে (১৭ বছর, ২৪৯ দিন) ও ১৯৮২ সালে ইতালির গিউসেপ্পে বারগোমির পর তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেললেন ইয়ামাল। 

এদিন শুরুর একাদশে ছিলেন ১৯ বছর ও ১৭৮ দিনের কুবারসি। তাতে এক বিশ্বকাপের ফাইনালে দুজন টিনএজারকে খেলানো প্রথম দল হয়েছে স্পেন। 

সাবেক ইংল্যান্ড গোলকিপার জো হার্ট বিবিসি স্পোর্ট-কে বললেন, স্পেনের খেলার এমন একটি ধরন আছে, যার ধারেকাছে থাকার প্রমাণ বিশ্বের কেউ দেখাতে পারেনি। এই বিশ্বকাপে কেউ তাদের আঘাত করতে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে তারা প্রতিপক্ষের মাত্র ১০টি শটের মুখোমুখি হয়েছে। ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী থিয়েরি অঁরি ফক্স স্পোর্টস-কে বলেছেন, পরবর্তী বছরগুলোতে আধিপত্য করার সম্ভাবনা স্পেনের রয়েছে। 

তিনি বলেন, আমি তাদের পদ্ধতিকে কৃতিত্ব দিতে চাই, যেটা তারা খেলছে। কারণ স্পেন কখনো এভাবে জিততে অভ্যস্ত নয়। এবং এখন তারা প্রত্যেক পর্যায়ে জেতে। 

২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন স্পেন প্রধান কোচ হিসেবে লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়োগ দিলো, তখন খুব কম লোকই তার ওপর আস্থা রাখতে পেরেছিল। 

তারা ভাবতেও পারেনি যে এত অল্প সময়ে তিনি নেশন্স লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ জিতবেন তিনি। কাতারে শেষ ষোলোতে স্পেন মরক্কোর কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল। লুইস এনরিকে চলে যাওয়ার পর তার একজন উত্তরসূরির প্রয়োজন ছিল স্পেনের। 

বালাগ বললেন, তারা এমন একজনকে (দে লা ফুয়েন্তে) বেছে নিলো যিনি খেলার ধরন ও পদ্ধতি বুঝতেন। এটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি না কেউ ভেবেছিল তিনি এতটা সফল হবেন।

শেষ পাঁচটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের (২০০৮, ২০১২, ২০২৪) মধ্যে তিনটি জেতা স্পেনের দায়িত্ব এমন একজন নেবেন, যিনি বড় ক্লাবের ডাগআউটে কখনো দাঁড়াননি এটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৯৪ সালে খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেওয়ার ১৫ বছর পর দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের যুব দলের দায়িত্ব নেন। এই সময়ে তিনি নিচের স্তরের স্প্যানিশ লিগে, যুব দলে ও সহকারী কোচের ভূমিকায় ছিলেন। 

স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বিবিসি স্পোর্ট-কে বলেন, দে লা ফুয়েন্তে জানতেন এই খেলোয়াড়দের অনেকে অ্যাকাডেমি থেকে এসেছে এবং তারা একটি দল হিসেবে গড়ে উঠছে। এই দল শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক পর্যায়ে কাজ করার পর যখন সিনিয়র দলের দায়িত্ব নিলেন দে লা ফুয়েন্তে, তখন প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রক্রিয়ার প্রতি গুরুত্ব এবং ধৈর্য ও শান্ত থাকার শিক্ষা দেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। 

গত এক দশকে স্পেনের নারী ফুটবলও সমৃদ্ধ হতে শুরু করেছে। উচ্চ চাপের ম্যাচগুলোতেও তারা বড় সাফল্য পেতে শুরু করেছে। তিন বছর আগে মেয়েদের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের জয় এসেছিল। 

২০১৫ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে নামা দলটি তৃতীয় প্রচেষ্টাতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। স্পেনের নারী দল সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ ও ২০২৫ নেশন্স লিগে টানা শিরোপা জেতে।

গত ৫ বছরে স্পেন দলের সাফল্য

নারী ফুটবল (১১টি শিরোপা, ২০২২-২০২৬)

সিনিয়র দল : ১টি বিশ্বকাপ (২০২৩), ২টি নেশনস লিগ (২০২৪, ২০২৫)।

অনূর্ধ্ব-২০ দল : ১টি বিশ্বকাপ (২০২২)।

অনূর্ধ্ব-১৯ দল : ৫টি অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫, ২০২৬)।

অনূর্ধ্ব-১৭ দল : ১টি বিশ্বকাপ (২০২২), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪)।

পুরুষ ফুটবল (৫টি শিরোপা, ২০২২-২০২৬)

সিনিয়র দল : ১টি বিশ্বকাপ (২০২৬), ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪), ১টি নেশনস লিগ (২০২৩)।

অনূর্ধ্ব-২৩ দল : ১টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০২৪)।

অনূর্ধ্ব-১৯ দল : ১টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৬)।


  বিষয়:   বিশ্বকাপ  আর্জেন্টিনা  শিরোপা জয়  স্পেন 


Loading...
Loading...

খেলা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: