টানা এক সপ্তাহের অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভয়াবহ পাহাড় ধসের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৪টি পাহাড়ি ও উপকূলীয় জেলায় মোট ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বন্যায় এই অঞ্চলের ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। গত রোববার থেকে কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও এখনো বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে আছে।
মন্ত্রণালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃত ৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়। সেখানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে মারা গেছেন ৩১ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আকস্মিক এই দুর্যোগে আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন, যাদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন এবং বান্দরবানে ২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানি নামতে শুরু করায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের ক্ষয়ক্ষতির ভয়ংকর চিত্র ভেসে উঠছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি, আউশের বীজতলা এবং সবজি ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। জেলাজুড়ে ভেসে গেছে ১০ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও চিংড়ি খামার, যার প্রাথমিক আর্থিক ক্ষতিই ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রধান প্রধান পাহাড়ি সড়ক ধসে পড়া এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বান্দরবানের লামা, রোয়াংছড়ি এবং কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়ার বহু প্রত্যন্ত অঞ্চল এখনো বিদ্যুৎহীন ও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোর ৯০টি পয়েন্টে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিপন্ন মানুষদের আশ্রয় দিতে সরকারিভাবে মোট ১ হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ অবস্থান করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৯ হাজার টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে নৌকার সংকট ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করায় এখন উপদ্রুত এলাকায় ডায়রিয়া, আমাশয়সহ জলবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট চলছে।
পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর এই বিশাল ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং বিধ্বস্ত যোগাযোগ অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।