মরদেহ দাফনের জন্যও মিলছে না শুকনো জমি

এসএম শামসুজ্জোহা

সারাদেশ

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ধস এবং উজানের ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা

2026-07-14T10:35:54+00:00
2026-07-14T10:35:54+00:00
  মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
টানা বর্ষণ ও বন্যায় বিপন্ন জনপদ
মরদেহ দাফনের জন্যও মিলছে না শুকনো জমি
এসএম শামসুজ্জোহা
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
টানা বৃষ্টি, পাহাড়ধস এবং উজানের ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। 

বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকটে পড়েছেন। কারও কোলে ক্ষুধার্ত ও আতঙ্কিত ছোট্ট শিশু, কারও হাতে জীবনের শেষ সম্বলটুকু। চারদিকে শুধু থই থই পানি। এই সর্বগ্রাসী রূপের মাঝে সবাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন একটুকরো শুকনো মাটি আর একটু নিরাপদ আশ্রয়। 

কোথাও ৮০ বছরের বৃদ্ধ বাবাকে পিঠে নিয়ে অসহায় সন্তানের আকুতি, আবার কোথাও দুই বছরের নিষ্পাপ শিশুকে দাফন করার মতো এক চিলতে শুকনো জমিও মিলছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখন পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি।

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল আর উজানের পানির তোড়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক প্রলয়ংকরী দুর্যোগ। চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে জনজীবন এখন কার্যত অচল। 

বন্যা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস আর সড়ক বিচ্ছিন্নতায় লাখ লাখ মানুষ এখন প্রকৃতির কাছে জিম্মি। টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অনেক এলাকা। 

তবে গত দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে; যদিও এখনো সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন কমবেশি প্লাবিত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পানিবন্দি হয়ে রয়েছেন প্রায় চার লাখ মানুষ।

জানা যায়, টানা বর্ষণ ও প্রবল বন্যায় প্রতিনিয়ত তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। শনিবার সাতকানিয়া পৌরসভার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় পরিবারের অগোচরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় দুই বছরের শিশু ইসমাইল হোসেন। 

তার বাবা জয়নাল আবেদীন জানান, কিছুক্ষণ পর খুঁজতে গিয়ে বাড়ির পাশের বন্যার পানিতেই তার নিথর দেহ পাওয়া যায়। একই দিন বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নেও বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে ডুবে মারা যায় আরও দুই শিশু। 

এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, ‘মরদেহ দাফনের জন্যও শুকনো জায়গা মেলেনি। পরে কিছুটা উঁচু এলাকায় এক পুকুরপাড়ে কবর দিতে হয়েছে।’ 

সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নে ঘটেছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। আলতাব আলী চৌধুরী জামে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে সাঙ্গু নদীর পানি ঢুকে তীব্র স্রোতে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনটি লাশ কবর থেকে ভেসে গিয়ে পাশের ঝোপঝাড়ে আটকে পড়ে। পরে স্থানীয়রা মরদেহগুলো উদ্ধার করে অন্য একটি নিরাপদ কবরস্থানে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করেন।

অন্যদিকে গতকাল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে লাশ ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় স্থানীয় বাসিন্দাদের। বন্যার পানির মধ্যে ভেলায় একটি মরদেহ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে দাবি করা হয়, বন্যার কারণে দাফন করার মতো শুকনো মাটি না পাওয়ায় মরদেহ ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন ব্যক্তি কলাগাছের তৈরি একটি অস্থায়ী ভেলায় সাদা কাফনে জড়ানো একটি মরদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। 

ভিডিওতে দেখা গেছে, চারদিকে থই থই করছে বন্যার পানি। ডুবে আছে চারদিক। এর মধ্যেই এক ব্যক্তির লাশ ভেলায় তুলছেন কয়েকজন। ভেলায় ভাসিয়ে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হয় লাশটি। এরপর একটি অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে করা হয় দাফন। 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকায় গত শুক্রবার ঘটেছে এ ঘটনা। মারা যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ ফোরকান (৬০)। তিনি পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। তার বাড়ি উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নে। শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে মারা যান তিনি। পরে রাতে তার লাশ দাফন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে ফোরকানের ঘর, উঠান, পারিবারিক কবরস্থানসহ পুরো এলাকা ডুবে ছিল। এর মধ্যেই শুক্রবার সকালে বন্যার পানিতে জাল দিয়ে মাছও ধরছেন ফোরকান। তবে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন তিনি। এরপর বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়। তবে ঘর-উঠান বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় নিজ বাড়িতে লাশের গোসল দেওয়া সম্ভব হয়নি। পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করাও যায়নি। 

পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্যার কারণে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাটে নিয়ে গিয়ে ফোরকানের লাশের গোসল দেওয়াসহ দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়। এরপর ওই এলাকার ফকির মুড়া ঈদগাহ এলাকায় ওইদিন রাত ১০টার দিকে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে সেখানে পাহাড়ের খাস জায়গায় দাফন করা হয় ফোরকানকে। জানাজায় ইমামতি করেন তার বড় ছেলে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম। 

তবে নিহত মো. ফোরকানের আরেক ছেলে রাসেল উদ্দিন জানান, ‘বাড়ির পাশেই আমাদের পারিবারিক কবরস্থান আছে। আমার দাদা-দাদিসহ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের সেখানে কবর দেওয়া হয়েছে। বাবাও বলতেন, তাকে যেন দাদা-দাদির পাশেই কবর দিই। কিন্তু বন্যার কারণে বাবার সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হলো না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বাবা যখন মারা যান, তখন আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে কোমরসমান পানি ছিল।’ জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। 

গতকাল গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘এখনো ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। ফোরকানদের বসতবাড়ি, কবরস্থান ও চলাচলের পথ প্লাবিত থাকায় তার লাশ ভেলায় করে শুকনা স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে। এরপর অনেক দূরে সরকারি জায়গায় উন্মুক্ত কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।’ 

এদিকে, সাতকানিয়ায় বন্যাকে কেন্দ্র করে এমন আরও তিনটি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রশাসন। ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান মোবাইলে জানান, উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নে বন্যার পানির প্রবল স্রোতে একটি কবরস্থানের কয়েকটি কবর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেখান থেকে সরে যাওয়া তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা অন্য একটি নিরাপদ কবরস্থানে পুনরায় দাফন করেন। 

তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে সাত জেলায় ব্যাপক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। 

রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। 
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত সাত জেলা হলো- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম। জেলার ১৬টি উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার। জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ মানুষ অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, নগদ অর্থ, শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। 

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: