মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমদানি করা তেলের মধ্যে থাকবে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল (গ্যাস অয়েল) এবং ৯০ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখা এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এই জ্বালানি তেল কিনছে। সম্প্রতি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, সরকার সাধারণত ছয় মাস পরপর চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করে। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই এ প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রশাসনিক অনুমোদনের পর বিপিসি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (নোয়া) পাঠাবে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হলে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ শুরু হবে।
বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে নোয়া জারি করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরই সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, সরকারের লক্ষ্য হলো যেকোনো পরিস্থিতিতে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে আরও বাড়ানো হচ্ছে।
বিপিসির প্রস্তাব অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২৫ পয়সা বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে এই ব্যয় কিছুটা বাড়তে বা কমতে পারে।
আমদানির অর্থ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করা হবে। প্রয়োজন হলে ঋণ কিংবা সরকারি সহায়তাও নেওয়া হতে পারে।
বিপিসির প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক সংকট দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। বিপিসির মতে, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমান সংকট আরও জটিল।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
তবে জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। প্রায় ৬০ দিনের মজুত রয়েছে এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর কাজও এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।