মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পানের বাজারে এবার চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। তীব্র গরমে পানের পাতা শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারমূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না চাষিরা। এতে শত শত পানচাষি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
শিবচর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকে শিবচরের কাঁচিকাটা এলাকার মিষ্টি পান দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। বর্তমানে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে ৪৮৭ জন কৃষক পান চাষ করছেন। এখানকার উৎপাদিত পান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পাশাপাশি একসময় বিদেশেও রপ্তানি হতো।
কাঁচিকাটার বিভিন্ন পানের বরজ ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা নিয়মিত পরিচর্যা করছেন। কেউ গাছে বাঁশের ঠেস দিচ্ছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ বাজারজাতের জন্য পান তুলছেন। তবে সবুজে ভরা বরজের মাঝেও কৃষকদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি।
দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে পান চাষ করে আসা মালেক সরদার বলেন, এবারের মতো খারাপ অবস্থা আগে দেখিনি। বাজারে পান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না। বরজ ভেঙেও লাভ নেই, আবার রেখেও লোকসান।
চাষি পরিমল শাহ জানান, এক বিঘা জমিতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, শ্রমিকের মজুরিও জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরেক চাষি শুনিল বারৈই বলেন, গত বছর এক বিড়া (৭২টি) পান ২২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার একই পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। তীব্র গরমে পান শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারেও ন্যায্য দাম মিলছে না। অথচ অন্য ফসলের মতো পানচাষে কোনো সরকারি প্রণোদনা নেই।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলীমুজ্জামান বলেন, শিবচরের মিষ্টি পানের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বাজারমূল্য কম থাকায় অনেক কৃষক লোকসানের শিকার হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একসময় এ অঞ্চলের পান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। বর্তমানে সেই রপ্তানি প্রায় বন্ধ। পানচাষিদের সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
পানচাষিদের দাবি, এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিখাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তা না হলে শিবচরের সুপরিচিত মিষ্টি পানের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।