প্রবাসীদের নিজেদের দাবি-দাওয়া বাদ দিয়ে দেশের জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার (২১ জুন) মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরে সাংগ্রি লা হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আজকে আমাদের কি দাবি আছে, সেটা থেকে বেরিয়ে এসে আসুন।
আমরা চিন্তা করি, আমাদের কি কর্তব্য আছে দেশের প্রতি। ‘হোয়াট উই ক্যান ডু ফর কান্ট্রি’। এদিন স্থানীয় সময় রাত পৌনে ৯টায় দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালা লামপুরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কুয়ালা লামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমানকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তার সহধর্মিণী হানানি হারুন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সুসজ্জিত বাহিনীর গার্ড অব অনারের সময়ে দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত সাড়ে ৯টায় সরকারপ্রধানকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে কুয়ালা লামপুরের ‘সাংরি লা’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি ও তার সফরসঙ্গীরা থাকবেন।
পরে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আসেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রিয় প্রবাসী ভাই-বোনেরা আপনাদের সকলের কাছে দেশবাসীর পক্ষ থেকে একটি কথা রাখব…আসুন আজকে থেকে আমরা চিন্তা করি, আমরা কি করতে পারি দেশের জন্য? এটাই হোক আমাদের আজকের চিন্তা। আপনাদের কাছে এই আশা রেখে, এই চাওয়া রেখে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
তার আগে তারেক রহমান গত দেড় দশকে ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনে দেশের কী অবস্থা হয়েছিল, তা তুলে ধরেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে।
তিনি বলেন, দেখুন দেশ থেকে কেউ একজন, একটি গোষ্ঠী দেশ থেকে নিতে নিতে দেশটিকে একদম শেষ করে দিয়েছে আজকে, দেশটাকে একদম ধবংস করে দিয়েছে। কিছু করার ছিল না, আমরা চেষ্টা করেছি, বুকের রক্ত দিয়ে মানুষ দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করেছে।
এখন আসুন আমরা সকলে মিলে দেশের জন্য কি করতে পারি …এটিতে আমরা থাকি। সকলে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
দেশ গঠনে নিজের চিন্তা ও পরিকল্পনাগুলো প্রবাসীদের কাছে তুলে ধরেন তারেক রহমান। বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আমার চিন্তার কথাগুলো আপনাদেরকে বলেছি। আপনারা যদি মনে করেন যে এইভাবে আমরা এগোতে পারবো দেশকে নিয়ে, যারা বিশ্বাস করবেন কথাগুলো। দোয়া করবেন যাতে এগুলার বাস্তবায়ন আমরা করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী গল্পের মতো নিজের পরিকল্পনা একে একে প্রবাসীদের কাছে তুলে ধরেন। মাঝে মাঝে করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী চিন্তাভাবনার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন তারা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সামনে একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। তবে এখানে একটি বিরাট ‘তবে’ আছে।
‘তবে’ হচ্ছে যে, আমাদেরকে এর জন্য পরিশ্রম করতে হবে, আমাদেরকে এর জন্য কষ্ট করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে যে আমাদেরকে এর জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, যে কথাটি দিয়ে আমি শুরু করেছিলাম যে দেখুন আসার সময় যেই জিনিসটা সবচেয়ে বেশি, এটা তো ঠিক আছে নতুন রাস্তা হবে, বিল্ডিং হবে…এগুলা তো চোখে পড়ে। এটা তো কোন জিনিস না। যে উদাহরণটা আমি আপনাদের সামনে দিয়ে শুরু করেছিলাম যে কুয়ালালামপুর থেকে রাস্তাগুলো অনেক পরিষ্কার লেগেছে আমার কাছে এবং এই পরিষ্কার করার কাজটি কিন্তু আমার দেশের ভাইরাই করছে।
আমার কথা হচ্ছে আমার দেশের ভাইরা যদি এখানে পারেন, তাহলে আমরা দেশে কেন পারব না? দেশে কেন করব না? প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময়ে উপস্থিত প্রবাসীরা তাদের সমস্যার কথা একযোগে বলতে চাইলে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়, তখন প্রধানমন্ত্রী সকলকে শান্ত হতে বলেন।
আপনারা সবাই একসাথে কথা বলেন, কেউ কাউকে কথা বলতে দিচ্ছে না। তার ফলে কোনটাই হচ্ছে না, কারোটা কেউ বুঝতে পারছে না, কারোটা কেউ শুনতে পাচ্ছে না এবং আমিও কিছু করতে পারছি না। এই জায়গাটা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।
এক এগারো প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেখুন, বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেন এর পরে এবং তারপরেও বিভিন্ন সময় কতগুলো ঘটনা ঘটেছিল আমার সাথে, কতগুলা ঘটনা ঘটেছে আমার মায়ের সাথে, কতগুলো ঘটনা ঘটেছে আমার ভাইয়ের সাথে…বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। আপনাদের হয়ত সেগুলো ভুলে গেছেন।
সেই সময় হয়ত অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু এখন ভুলে গেছেন। আম্মা (খালেদা জিয়া) একবার খুব অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় একটি হসপিটালে অ্যাম্বুলেন্স চাওয়া হয়েছিল। তারা অ্যাম্বুলেন্সটি দেয় নাই সেদিন। ঠিক আছে।
এখন এই মুহূর্তে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে… আই এম দ্য প্রাইম মিনিস্টার… আমি চাইলে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে হয়ত আমি প্রতিশোধ নিতে পারি? কিন্তু আমি যদি নেই তাতে ‘বেনিফিট’টা কী হবে বলতে পারেন? কারো কোন ‘বেনিফিট’ হবে? কোনো ‘বেনেফিট’ হবে না। এই বিষয়টা থেকে আমাদের বেরুতে হবে।
নিজেদের দাবি ছাড়তে হবে : তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি সকলে মিলে হৈচৈ করি, সকলে মিলে যদি নিজেরটা দাবি করি তাহলে কোনোটিই হবে না, শুধু যদি নিজেরটা আমরা চিন্তা করি, কোনোটিই হবে না।
দেশ আমাদের সবার। আমাদেরকে সবাইকে ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে এগোতে হবে।
আপনি প্রবাসী, আমি তো দেশি : প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে উপস্থিত সবাইকে বলব, আপনি প্রবাসী, হ্যাঁ আপনি প্রবাসী। আমিও তো দেশি। আপনার যেরকম দেশের ওপরে দাবি আছে, আমার ওপরে দেশের উপরে দাবি আছে। রাইট। আসেন না কথাটাকে ‘চেইঞ্জ’ করি আমরা।
তিনি বলেন, দাবি কথাটা কেন আমরা বারে বারে বলি? কেন আমরা ভিন্নভাবে চিন্তা করি না? আমরা দাবিটাকে ভুলে গিয়ে কেন আমরা বলি না, প্রবাসী হিসেবে আপনার যেরকম দেশের প্রতি কর্তব্য আছে, দেশি হিসেবে আমরাও তো দেশের প্রতি কর্তব্য আছে।
আসুন আমাদের কি দাবি আছে সেটা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা চিন্তা করি আমাদের কি কর্তব্য আছে দেশের প্রতি?
তিনি বলেন, আমরা কি নেব দেশ থেকে, এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রবাসীদের দাবি প্রসঙ্গে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মানি বা না মানি এখানে তো আপনাকে এই দেশের আইনে চলতে হবে। এখানে আপনি আবদার করলে তো চলবে না। আমাদেরকে তো এই দেশের আইনে চলতে হবে।
মালয়েশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের কী কী অসুবিধা আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলবেন তারা। তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
কিন্তু তারা তো আর তার দেশের আইনের বাইরে যাবে না, তারা তাদের দেশের আইনের ভেতরে থাকবে। সেই আইনের ভেতরে থেকে যতটুকু আমরা আমাদের প্রবাসীদের জন্য সুবিধা আদায় করতে পারি বা সুবিধা তৈরি করতে পারি, আমরা সেটা অবশ্যই করব।
এ সময়ে প্রবাসীরা করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যকে স্বাগত জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার হাই কমিশনার মঞ্জুরুল করিম। ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মালয়েশিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক ডিএম মোশাররফ হোসেন।
সোমবার (২২ জুন) সকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। পরে নিজ নিজ দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন তারা।
‘পেরদানা পুত্রা’ সেজেছে বাংলাদেশের পতাকায় : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’ ভবনের চারপাশে উড়ছে লাল সবুজ পতাকা। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার পতাকা দিয়ে পুরো সড়ক বর্ণাঢ্যভাবে সাজানো হয়েছে।
শনিবার বিকালে পুত্রাজায়ার গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। পুত্রাজায়া স্কয়ারের আশপাশেও দেখা গেছে একই চিত্র।
সেখান থেকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক কার্যালয়ের আশপাশের সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দুই দেশের পতাকা টাঙানো হয়েছে।
রাজধানী কুয়ালা লামপুর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’ ভবনটি মালয়, মুঘল, ইউরোপীয় ও ইসলামিক স্থাপত্যের চমৎকার সংমিশ্রণ, যার কেন্দ্রে রয়েছে আইকনিক সবুজ গম্বুজ।
এ ভবনের সামনের মাদানি স্কয়ারও দুই দেশের পতাকায় সেজেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় এ ভবনে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
এখানে তারা একান্তে বৈঠক করবেন; দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হবে।