ফুটবল এমন একটি খেলা, যাতে ২২ জন ৯০ মিনিট ধরে খেলে এবং শেষমেষ জার্মানি জেতে, ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারের পর, হতাশ হয়ে এই মন্তব্যটি করেছিলেন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড় গ্যারি লিনেকার। ফুটবলের মাঠে জার্মানদের শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে নির্দেশ করতে এরপর এই উক্তিটি বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। যখন শুরু করেছি, তখন থেকেই জানি, আমরা ফেভারিট নই। কিন্তু যারা ফেভারিট নয়, তারা বিস্ময় উপহার দিতে পারে, কথাগুলো ডিক অ্যাডভোকেট এর। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ তো বটেই, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যিনি সবচেয়ে বয়সী কোচ।
অ্যাডভোকেট এর দল কুরাসা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ। যার ভূমির পরিমাণ মাত্র ৪৪৩ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা দেড় লাখের একটু বেশি। এই দলটি রোববার ই গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হিউস্টনে মুখোমুখি হবে জার্মানির।
বিশ্বকাপের চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি স্বাভাবিকভাবেই অনেক এগিয়ে কুরাসাওয়ের চেয়ে। তবে, অ্যাডভোকেট এর হাত ধরে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে উঠে এসেছে কুরাসাও। এমনকি, এই ডাচ কোচ নিজেও আছেন ইতিহাস গড়ার পথে।
চলতি আসরে, সবচেয়ে বয়সী কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়ানোর রেকর্ড ইতোমধ্যে দুইবার ভাঙা-গড়া হয়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউট দাঁড়ানো উগো ব্রুশের বয়স ছিল ৭৪ বছর। এরপর ডাগআউটে দাঁড়ান চেকিয়া কোচ মিরোস্লাভ কৌবেক (৭৪)। ব্রুশের জন্ম ১৯৫২ সালের ১০ এপ্রিল, কৌবেকের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। সেখানে অ্যাডভোকেট ৭৮ বছর বয়সী! জার্মানির বিপক্ষে ডাগআউটে দাঁড়ালেই সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচের রেকর্ডটা গড়ে ফেলবেন এই তিনি। তার দলের সব খেলোয়াড়ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। ডাচদের অধীনে কুরাসাও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, তাই।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কুরাসাও দলের হাল ধরেন অ্যাডভোকেট। তার হাত ধরে, বাছাইয়ে ১০ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ২৮ গোল করে দলটি, কনকাকাফ অঞ্চলে কোনো দলের সর্বোচ্চ গোলও এটি। মাঝে অবশ্য টানাপোড়েনের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট নিজেও। অসুস্থ মেয়ের পাশে থাকতে ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। মেয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে এবং অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ফ্রেড রুটেনের কোচিংয়ে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে কুরাসাও ধুঁকলে, তিনি ফেরেন মে মাসে। সেই অ্যাডভোকেট এখন ইতিহাস গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে। এই ক্ষণ তিনি রাঙাতে চান জয়ের আনন্দে। জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে চমকে দিতে চান সবাইকে। বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশের কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাকে আমি আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি মনে করি। আমি আমার খেলোয়াড়, স্টাফ, বোর্ড সদস্যদের নিয়ে গর্বিত, যারা আমার উপর আস্থা রেখেছিলেন।
যখন শুরু করেছি, তখন থেকেই জানি, আমরা ফেভারিট নই। কিন্তু যারা ফেভারিট নয়, তারা বিস্ময় উপহার দিতে পারে। আর দুই বা তিন পয়েন্ট নিয়েও পরের ধাপে যাওয়া সম্ভব। চারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির (তিনবার পশ্চিম জার্মানি নামে) জন্য সাম্প্রতিক সময়টা বেশ খারাপই যাচ্ছে। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দাপটের সাথে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত দুই আসরেই ইউরোপের এই পরাশক্তিটি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আটবার ফাইনাল খেলে জার্মানি এর আগে মাত্র একবারই প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েছিলো, সেই ১৯৩৮ সালে, যখন দেশটিতে ছিল হিটলারের শাসন।
উপরের লিনেকারের উক্তিটি জার্মানি বহুবার প্রমাণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে ১৯৫৪ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সে যুগের সেরা দল হাঙ্গেরিকে ফাইনালে হারিয়ে। এর ২০ বছর পর আরেকটা ফাইনাল জেতে আধুনিক টোটাল ফুটবলের প্রতিষ্ঠাতাকারী দেশ নেদারল্যান্ডসকে পরাজিত করে।
ফলে, জার্মান সমর্থকেরা আশা করবেন যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আর, এই ঘুরে দাঁড়ানোটা হবে ৩৯ বছর বয়সী কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যানের পরিচালনায়।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একাধিক লীগ জেতা নাগেলসম্যানকে ধরা হয় ইউরোপের অন্যতম কোচিং প্রতিভা হিসেবে, যিনি অল্প বয়স থেকেই আধুনিক জার্মান ফুটবল দর্শনের একজন মনোযোগী ছাত্র। তার কৌশলের মূল ভিত্তি হচ্ছে হাই প্রেসিং, কৌশলগত নমনীয়তা, অবস্থানগত ফ্লুইডিটি এবং আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং। ফলে জার্মানি দলটি এখন আধুনিক বুন্দেসলিগার তীব্রতা ও পজিশনাল ফুটবলের একটি সফল হাইব্রিড। জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজ কেবল দুইজন বিশ্বসেরা ফুটবলারই নন, তাদের মধ্যে রসায়নটাও জমাট। নাগেলসম্যান চাইবেন, এই দুইজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে অর্কেস্ট্রার মতো একটি দল হয়ে উঠতে। নাগেলসমানের জার্মানি কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেশনে আটকে থাকে না। তারা মূলত ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩-এ খেলে, কিন্তু খেলার প্রবাহ অনুসারে সহজেই ৩-৪-২-১ বা ৩-২-৫-এ রূপান্তরিত হয়।
জার্মানির রক্ষণাত্মক কৌশলও উচ্চ ঝুঁকির উপর নির্মিত। অ্যান্টোনিও রুডিগার, জোনাথন তাহ ও নিকো শ্লটারবেকের মতো সেন্টার-ব্যাকরা আগ্রাসন, এরিয়াল ডুয়েল এবং বল বিল্ড-আপে দক্ষ। কিন্তু ট্রানজিশন ডিফেন্স তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। হাই প্রেসিং করতে গিয়ে পেছনে অনেক ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। দ্রুত গতির উইঙ্গার ও ফরোয়ার্ডযুক্ত দলগুলো এই স্পেস সহজেই কাজে লাগাতে পারে। তবে, জার্মানির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজের জুটি। ফুটবলবিশ্বে যাদেরকে উইসিয়ালা নামে ডাকা হয়। এই জুটির সৌন্দর্য তাদের পরিপূরকতায়।
রেকর্ড পাঁচবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আশায় জার্মানির অভিযান শুরু হবে ১৪ই জুন হিউস্টনে। এনআরজি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই খেলাটি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাসেই অন্যতম ডেভিড বনাম গোলিয়াথের খেলা। জার্মানির প্রতিপক্ষ কুরাসাওয়ের জন্য সেই ম্যাচটি হবে বিশ্বকাপের অভিষেক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৮৩তম দল হিসেবে তারা অংশ নেবে, তবে দক্ষিণ ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি এই দ্বীপটি সেইদিন অনন্য এক রেকর্ড করবে। এই দ্বীপের আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা মাত্র এক লাখ ৫৫ হাজার। বাংলাদেশের বেশিরভাগ উপজেলাতেই লোকসংখ্যা এর চেয়ে বেশি। কুরাসাওয়ের আগে এত ছোট আয়তন এবং জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো দল খেলেনি। কুরাসাও আগে নেদারল্যান্ড এন্টিলিসের অংশ হিসেবে ফুটবল খেলত। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস ভেঙে গেলে কুরাসাও আলাদা জাতীয় দল হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অংশ নিতে শুরু করে। ২০১৭ সালে তারা প্রথমবারের মতো কনকাফাক গোল্ডকাপে জায়গা করে নেয়। একই বছরে ক্যারিবিয়ান কাপ জিতে তারা আলোচনায় আসে। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কুরাসাও অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখায়। জামাইকা, বারমুডা ও ত্রিনিদাদকে পেছনে ফেলে দলটি গ্রুপে শীর্ষে ওঠে। শেষ ম্যাচে জ্যামাইকার সঙ্গে ০-০ তে ড্র করে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে কুরাকাও, যা ডাচ সাম্রাজ্যের অধীনে একটি সার্বভৌম দেশ। দেশটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার সামলালেও বিদেশনীতি এবং প্রতিরক্ষার জন্য ডাচ সাম্রাজ্যর উপর নির্ভর করে। প্রথম খেলাতেই আরো একটি রেকর্ড হবে। জার্মান কোচ নাগেলসম্যান এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম বয়সী কোচ অন্যদিকে অ্যাডভোকেট হচ্ছেন সবচেয়ে বয়স্ক কোচ। কুরাকাওয়ের এই কোচের বয়স ৭৮, জার্মান কোচের ঠিক দ্বিগুন। ফলে, সেই ম্যাচটি হবে দুইটি ভিন্ন প্রজন্মের এক ট্যাকটিকাল যুদ্ধ। বড়সড় অঘটন না হলে, তরুণ নাগেলসম্যান সহজেই এই যুদ্ধে জিতবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনিশ্চয়তাই জার্মানির ২০২৬ বিশ্বকাপ যাত্রাকে রোমাঞ্চকর করে তুলবে। তারা হয়ত বিশ্বকে চমকে দিতে পারে, আবার হঠাৎ ধসেও পড়তে পারে। ফুটবলপ্রেমীরা এই নতুন জার্মানির দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন।