জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেন বংলাদেশের পিছু ছাড়ছে না। হঠাৎ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, আবার প্রচন্ড দাবদাহ, একইসাথে তীব্র লোডশেডিং; এসবের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের বেসরকারি খাত।
বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও প্রচন্ড গরমে শারীরিক ও মানসিকভাবে কর্মক্ষেত্রেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন একাধিক কারখানার শ্রমিক। অনেকে ছেড়েছেন চাকরি। ফলে আশক্সক্ষাজনকভাবে কমছে কর্মঘন্টা; ব্যাহত হচ্ছে তৈরি পোশাক, কৃষিসহ নানা শিল্পের উৎপাদন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ ভোরের ডাককে বলেন, দেশের বৃহৎ কারখানাগুলো থেকে প্রচুর সিএফসি গ্যাস, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ছড়ায়, যা শুধু কারখানার কর্মীদেরই ক্ষতিই করে না বরং আশেপাশের পুরো এলাকার ক্ষতি হয়।
তিনি বলেন, অনেক কারখানা পরিবেশগত ছাড়পত্র ঠিকমত নিচ্ছে না, যার কারণে অনেক সময় তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। কারখানাগুলো বনায়ন করলে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ালে গ্লোবাল ওয়ার্মিং (বৈশ্বিক উষ্ণায়ন) কমিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে, বাংলাদেশে গত এক মাসের আবহাওয়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বহু জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। অনেক স্থানে দিনের তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে যা অনুভূত হয়েছে ৪২ এর মত। তবে গড় তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ব্যাপক, যার কারণে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। একই সময়ে প্রচন্ড দাবদাহের মধ্যে চলছে লোডশেডিং। ঢাকায় স্বাভাবিক লোডশেডিং হলেও আশপাশের শিল্প জেলাসহ সারাদেশে ৪ থেকে ১২ ঘণ্টাও লোডশেডিং লক্ষ করা গেছে।
এছাড়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে জেনারেটরের ব্যবহার সীমিত করে দিয়েছে অসংখ্য মালিকপক্ষ। জ্বালানি সাশ্রয় করে উৎপাদন খরচ কমাতে কারখানাগুলোতে প্রায়ই লাইট, ফ্যান, কুলারসহ অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ২৮৪টি কারখানা আন্তর্জাতিকভাবে ‘সবুজ কারখানা’র স্বীকৃতি পেলেও উৎপাদন খরচ কমাতে অধিকাংশ কারখানায় ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ পরিবেশ নেই। তপ্ত পরিবেশে তাই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অসংখ্য শ্রমিক। একইসাথে কলকারখানার কার্যক্রম অস্বাভাবিক হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর নিকটবর্তী গাজীপুরে অবস্থিত প্যান এশিয়া ক্লদিং লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় ২ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করছেন। গত মাসে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক মাথা ঘোরানো ও বমির সমস্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। এদের মধ্যে কেউ সুস্থ হয়ে কর্মে ফিরেছেন, কেউ চাকরি ছেড়েছেন।
গতবছর গাজীপুরের কেজেএল ফ্যাশন লিমিটেড সোয়েটার কারখানায় কাজ করার সময় টিঠন মিয়া নামের এক শ্রমিক হিটস্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রচন্ড গরমে চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ ও সাভারের আশুলিয়া এলাকায় অসংখ্য পোশাকশ্রমিক মানসিক অবসাদ, বমি, মাথা ঘোরানো, শ্বাসকষ্ট নিয়ে অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জানা যায়, এসব এলাকার কারখানাগুলোতে মাঝেমধ্যেই উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশে নেমে আসে।
তীব্র দাবদাহের কারণে বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং কর্মক্ষমতা যে হারে কমছে, তা রীতিমতো আশঙ্কাজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১০০ দিনেরও বেশি সময় বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ‘অ্যান আনসাস্টেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে তাপজনিত অসুস্থতার কারণে দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৩৩ কোটি থেকে ১৭৮ কোটি ডলার (অন্তত ২১ হাজার কোটি টাকা), যা দেশের মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
বেসরকারি খাতের এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষণা সতর্ক করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পোশাক খাতে বড় ধরনের আয়ের ক্ষতি এবং প্রায় ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশে আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তনে শুধু পোষাকখাতেই নয়, কৃষিখাতেও ব্যাপক লোকসান হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসের অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় ৪৬ হাজার থেকে ৪৯ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলায় সামান্য বৃষ্টি হলে কিংবা পূর্বাবাস দেখা গেলে অতিরিক্ত লোড শেডিং দেওয়া হয়। যার কারণে জেলার প্রধান মৎস্য এলাকা চরফ্যাসনে ৩৫টি বরফকলের মধ্যে ২০টিই বন্ধ হয়ে গেছে।
বরফ সংকটে জেলেরা মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না এবং আড়তগুলোতে মাছ পচে যাওয়ায় মৎস্য খাতে কোটি কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন; ফ্রিজ-হিমাগারে রাখা পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান ভোরের ডাককে বলেন, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।
যেসব কারখানার কর্মক্ষেত্রে তাপ বের হয়, সেখানে প্রথমত বায়ুচলাচল ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। তাপ শোষণ ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবারহের জন্য কারখানার চারপাশে পর্যাপ্ত গাছ (সবুজায়ন), ওয়াটার বডি (জলাশয়) রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ইকো ফ্রেন্ডলি রাখতে পারলে অসুস্থতা কমবে, কর্মঘণ্টা ও উৎপাদন বাড়বে। শ্রমিকবান্ধব শীতল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবেশ ও শ্রম অধিদপ্তরের কড়া নজরদারি রাখা উচিৎ। কাজের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকলে বাধ্যতামূলক বিরতির নিয়ম কার্যকর করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) এক পরিচালক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রমিকদের সুরক্ষা চিন্তা করে খুব কম সংখ্যক মালিক। কারখানা ন্যাচারাল রাখতে অনেক কোম্পানী দেশি-বিদেশী সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন যতটা না ক্ষতি করে, লোডশেডিং এ ক্ষতির পরিমান বহুগুনে বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ অসহনীয় তাপপ্রবাহ ও বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেসরকারি খাতের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।