বেকারত্ব কমাতে বাজেটে কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

দীর্ঘদিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং নতুন কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে আসার কারণে দেশের অর্থনীতি আজ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন

2026-06-07T10:43:36+00:00
2026-06-07T11:56:36+00:00
  বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা
বেকারত্ব কমাতে বাজেটে কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব
সুমন হাওলাদার
রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ১০:৪৩ এএম  আপডেট: ০৭.০৬.২০২৬ ১১:৫৬ এএম
প্রতীকী ছবি
দীর্ঘদিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং নতুন কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে আসার কারণে দেশের অর্থনীতি আজ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের আশা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে, তৈরি হবে লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

অর্থমন্ত্রনালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। সরকারের বিশ্বাস, দীর্ঘদিন ধরে মন্থর হয়ে থাকা বিনিয়োগ প্রবাহকে সচল করতে পারলে শিল্প, কৃষি ও সেবা খাত নতুন করে গতিশীল হবে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে। বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। আবার অনেকেই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে দেশের বেকারত্ব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হতে হবে বেসরকারি খাত, শিল্পায়ন এবং নতুন বিনিয়োগ। ফলে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেটে কর্মসংস্থানকে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে।

জানাগেরেছ, সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘুরবে। নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে, রফতানি সম্প্রসারিত হবে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক দিনের পুঞ্জিভুত সমস্য্।া  সরকারের অন্যতম একটি কাজ করতে হবে যেটি হলো যুবাদের কর্মসংস্থান। বর্তমান সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। আরা এর প্রতিফলন চলতি বাজেটেই থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা না গেলে বড় ধরণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে না। বিশেষ করে যুবাদের স্বকর্মসংস্থানের জন্য লক্ষ্য অনুযায়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। গণ আন্দোলনের কারণ ছিলো কর্মসংস্থান। আন্দোলনকারীদের সরকারি চাকরির সুযোগ কম। একারণে ব্যক্তি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে, আইটি সেক্টর,  ফ্রিল্যন্সিং, ই-কমার্সে যুবাদের উৎসাহিত করেত হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয প্রনোদনা বা ফাইনান্সিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিশ্চয়তায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় কর্মসংস্থান হারিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। অনেক কারখানার রপ্তানি কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এই বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ‘প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে পরিচালিত হবে। প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধাও রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। এর ফলে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও শ্রমঘন শিল্প খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা গেলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। প্রকৃত উৎপাদনমুখী ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অর্থায়ন পায় এবং ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা কর্মসূচি বন্ধ শিল্পে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সরকারি সূত্র বলছে, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।এসব খাত তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানে এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।একই সঙ্গে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ খাতেও নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এবারের বাজেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভর করে গড়ে তোলা হবে। এই ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন-যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থনীতিতে অলিগার্ক কাঠামো ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের প্রকৃত অংশীদারত্ব থাকবে।

সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন,গত ৫ বছরে দেশের প্রায় ৪৬-৪৭ লাখ মানুষ বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৫-৭৫ ভাগই গেছে মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলোতে।  যারা দিদেশে যাচ্ছেন  তাদের অবশ্যই দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।  পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়ে নজর দিতে হবে, বিদেশে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে জিড়ো টলারেন্ট দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা অনেক দিন থেকেই বলছি বিদেশ যাত্রার খরচ কমাতে, কিন্তু কোনো সুরাহ করা যাচ্ছে না। রিক্রুটিং এজেন্সিকে বাগে আনা যাচ্ছে না। বিদেশে যেতে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের মতো করে খরচ কমাতে হবে। হয়রানি বন্ধ করে কর্মপরিবেশ তৈরিতেও সরকারতে নজরদারি বৃদ্ধির আহ্বান জানান এই অথনীতিবীদ ।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অর্থনীতি এখন একটি সংকটময় মোড়ে রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পরিস্থিতি সংকটে রূপ নিতে পারে। এ জন্য রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোশিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিল্প ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা। দেশের অর্থনীতির বর্তমান আকার প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার হলেও এর বিপরীতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন অর্থবছরের বাজেটে শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তি এখনো উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাত লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বর্তমান সময়ে স্থানীয় শিল্প বড় চাপের মুখে পড়েছে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: