একসময় শিবচরের গ্রামবাংলার আঙিনা, রাস্তার ধারে ও বাড়ির বাগানে দেখা মিলত নানা ধরনের দেশীয় ফলের গাছ। যেমন জাম, গাব, ডেউয়া, করমচা, কাউফল, চালতা,রোয়াইল, বেল, কদবেল, আতা, নোনতা,সবেদা, ফলসা, জামরুল, লটকন, পেপে,পেয়ারা, জাম্বুরা, তাল বিভিন্ন প্রজাতির কলাসহ অসংখ্য দেশীয় ফল ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আম ও কাঁঠাল, কলা ও পেপের বাণিজ্যিক চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক দেশীয় ফল এখন বিলুপ্তির পথে।
বাংলাদেশ ছয় ঋতুর মধ্যে গ্রীষ্মকালেই দেশীয় প্রজাতির ফলের সিজন। বিশেষ করে বৈশাখ জ্যেষ্ঠ মাসে জাম, জামরুল, ডাউয়া ও কাউসহ অনেক ফল পাওয়া যেতো। আর আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে পাকা তাল, জাম্বুরা, আমড়া ও চালতাসহ অনেক দেশিয় ফল পাওয়া যেতো। আজ বাণিজ্যিকভাবে আম, কাঠাল, লিচু, কলা, পেপে, পেয়ারা চাষ ছাড়া কোন ফল গাছ রোপন করছে না।
দিনদিন বৈদেশিক ফল আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর-এর গাছ রোপন করায় হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য সুস্বাদু দেশীয় প্রজাতির ফল; যাহা এখন প্রায় বিলুপ্ত।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কয়েক দশক আগেও গ্রামের শিশু-কিশোররা মৌসুমি দেশীয় ফল সংগ্রহ করে খেত। বর্তমানে অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আম ও কাঁঠাল চাষে ঝুঁকছেন।
ফলে দেশীয় ফলের গাছ কেটে সেখানে লাগানো হচ্ছে বাণিজ্যিক ফলের বাগান।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় ফল শুধু খাদ্যগুণেই সমৃদ্ধ নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক দেশীয় ফল ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উৎস হিসেবে পরিচিত।
তবে সচেতনতার অভাব, নগরায়ন এবং পরিকল্পনাহীন বৃক্ষনিধনের কারণে এসব ফলের গাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
শিবচরের কয়েকজন কৃষক জানান, বাজারে আম ও কাঁঠাল লিচুর চাহিদা এবং লাভ বেশি হওয়ায় তারা ওই ফলের চাষে আগ্রহী। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণও জরুরি বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, দেশীয় ফলের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাড়ির আঙিনা ও রাস্তার পাশে দেশীয় ফলের চারা রোপণ করা হলে হারিয়ে যেতে বসা ফলগুলো আবারও ফিরে আসতে পারে। প্রতিবছর ফলজ ও বনজ গাছ রোপনের মেলা হলেও উপজেলা প্রসাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা গাছ রোপনের পরামর্শ তেমন ভাবে দেয় না। কৃষি মেলার নামে সাত দিনের মেলায় পুতুল নাচ বিনোদন ছাড়া তেমন কিছু দৃশ্যমান থাকে না।
শিবচর উপজেলার উমেদপুর এলাকার গৃহিনী মাসুদা খানম টুম্পা বলেন, বিলুপ্ত প্রায় ফল গাছ শখের বসে রোপন করেছি। প্রতিবছর দেশীয় ফলের গাছ রোপন করি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেনো মনে রাখতে পারে।
টুম্পার দাবি প্রত্যেক ইউনিয়নে কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা রয়েছে তাদের মাধ্যমে প্রতি বাড়ির আঙ্গিনায় দেশীয় ফলের চারা রোপনের পরামর্শ দেয়, তাহলে এই ফলগুলো বিলুপ্ত হবে না।
স্থানীয় মুরুব্বিদের মতে, বাংলাদেশের ফলের বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাখতে বৃক্ষ রোপনের নামে মেলা না করে গাছ রোপনের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত, তাহলে দেশিয় ফল হারিয়ে যাবে না।
এই বৈচিত্র্য রক্ষায় বাণিজ্যিক ফলের পাশাপাশি দেশীয় ফলের গাছ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।