অনিশ্চয়তায় ৪০০ কোটি টাকার চামড়া সংগ্রহ

সুমন হাওলাদার

বাণিজ্য

অতিরিক্ত গরম, অসম লবন সরবরাহ, কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো আসন্ন কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা পুরো সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে

2026-05-18T11:29:01+00:00
2026-05-18T11:29:01+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
অনিশ্চয়তায় ৪০০ কোটি টাকার চামড়া সংগ্রহ
বিনামূল্যে লবণ দিতে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ
সুমন হাওলাদার
সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ১১:২৯ এএম 
ফাইল ছবি
অতিরিক্ত গরম, অসম লবন সরবরাহ, কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো আসন্ন কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা পুরো সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।  ফলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়ে। যার মূল যোগান দাতা ছিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা। ফলে ট্যানারি মালিকদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা টানাপড়েন।

কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিলেটসহ  ঢাকার প্রথম সারির বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসাও চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে ইচ্ছে করেই চামড়ার দাম কমানো হয়েছে। যাতে করে মাদ্রাসাগুলোতে আর্থিক সংকট তৈরি হয়।  সঠিকভাবে পরিচালতি হতে না পারে।  

ট্যানারি মালিকরা জানান, কওমি মাদ্রাসাগুলোর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশের চামড়া শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা। কারণ, দেশে বছরে উৎপাদিত মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই সংগৃহীত হয় কোরবানির ঈদে, যার সিংহভাগ আসে মাদ্রাসার মাধ্যমে। মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে কাঁচামাল সংকটে ট্যানারি শিল্প স্থবির হয়ে পড়বে এবং সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে চামড়া পাচারের ঝুঁকি তৈরি হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরজুড়ে সর্বসাধারণের দান, মৌসুমী চাঁদা এবং কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি থেকে অর্জিত আয়ই কওমি মাদ্রাসা ও এর আওতাধীন লিল্লাহ বোর্ডিং (এতিমখানা) পরিচালনা এবং অবহেলিত এতিম শিশুদের ভরণপোষণের প্রধান উৎস। কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই আয়ের খাতটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, ২০১৩ সাল থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসার এই আয়ের উৎস বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার বাজারে দরপতন ঘটায়। গত বছর চামড়া বিক্রি করেও লবণ কেনার টাকাও ওঠেনি।

শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আলেম সমাজের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বয়স মাত্র আড়াই মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে চামড়া বাজারের মতো একটি খাতের আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কাজ চলছে। এর জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে। বিগত সরকারগুলোর ভুল নীতি ও সিন্ডিকেটের ভাঙতে এই সরকার বদ্ধপরিকর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের  (বিটিএ) এক শীর্ষ নেতা বলেন,  আমাদের চামড়ার মূল যোগান দাতা হলো বিভিন্ন মাদ্রাসা। তারা চামড়া সংগ্রহ না করলে সাধারণ মানুষ চামড়া ফেলে দেবে। হাজার হাজার পিস চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে। এতে ট্যানারিগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি খাতে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালেও যে গরুর চামড়া প্রতিটি ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হতো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা নেমে আসে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অনেক স্থানে দাম না পেয়ে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন কিংবা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।

কোরবানির চামড়া সংগ্রহে গরম নিয়ে দুশ্চিন্তা : গত একদশক ধরে রপ্তানিপণ্য হওয়ায় পরেও অনেকটা ফেলনা পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পশুর চামড়া। লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম মেলে না দুইশ টাকাও। কোরবানির পশু হিসেবে জবাই করা গরু, মহিষ কিংবা ছাগলের চামড়া চট্টগ্রামের অনেক কোরবানিদাতাই বিনামূল্যে দান করেন ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। দাম কম হওয়ায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণেও আগ্রহ কমেছে ব্যবসায়ীদের।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য বলছে, বর্তমানে এক তৃতীয়াংশে নেমেছে নিবন্ধিত চামড়া আড়তদারের সংখ্যা।লবণ দিয়ে সময়মতো সংরক্ষণ করা না গেলে কাঁচা চামড়া পচে নষ্ট হয়ে যায়। এবার আবহাওয়া গরম। গরম হওয়ায় চামড়ায় দ্রুত পচন ধরবে। এজন্য এবার দ্রুত লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির পুরো টাকাই কোরবানি দাতারা হতদরিদ্র মানুষদের দান করেন। পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য না মেলায় সমাজের ওই শ্রেণির মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরেই কোরবানি পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও আসন্ন ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে।  এতিমখানা, মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংসমূহের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু, সামান্য অসচেতনতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি রোধে সরকার এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কাঁচা চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার এরইমধ্যে দেশব্যাপী মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া, উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের জন্য মোট ২৩২ কোটি টাকা ঋণের বরাদ্দ রেখেছিল ব্যাংকগুলো। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ৯টি ব্যাংক এই ঋণ বিতরণে অংশ নিয়েছিল। এবারও কোরবানি ঈদে পশুর চামড়া কেনার সুবিধার্থে ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নির্ধারণ করা যাবে না বলে উল্লেখ করেছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, চামড়া ব্যাবসায়ীদের ইতোপূর্বের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ থাকলে, আসন্ন কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া ক্রয়ের উদ্দেশ্যে নতুন ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিলকৃত ঋণস্থিতির বিপরীতে কম্প্রোমাইজড এমাউন্ট আদায়ের বাধ্যবাধকতা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত শিথিল করা হলো।

২০২৬ সালের জন্য সরকারি নির্ধারিত গরুর চামড়া (ঢাকা) প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা।খাসির চামড়া (সারা দেশ): প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গড়ে প্রতি বছর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ গরু ও মহিষ কোরবানি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৫৭ টাকা হিসেবে ১০ বর্গফুট ৫৭০ গড়ে হিসেব করলেও ৫০ লাখ গরুর চামড়ার দাম আসে ২৮৫ কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয় এটি হলো ছোট গরুর হিসেবে। বড় গরু আকার ভেদে ২৫-৩০ বর্গফুটও হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে কাঁচা চামড়ার বাজার প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হতে পারে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, কোরবানির ঈদের সময় কাঁচা চামড়া কেনাবেচা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কিছুটা অজ্ঞতা রয়েছে। তারা চামড়ার মাপ না বুঝেই সংগ্রহ করে থাকেন। যা পরে তাদের লোকসানের কারণ হয়। ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের বাদ দিয়ে সরাসরি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনে থাকেন, যা বাজারের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে। ট্যানারি মালিকরা সময়মতো আড়তদারদের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় তারা চামড়া কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পান না। ব্যাংক ঋণের সুবিধাও সবার কাছে পৌঁছায় না । ঈদের সময় সব ট্যানারি একসাথে চামড়া কেনা শুরু করলে বাজারে চাহিদা বাড়ে এবং দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকে।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হাসান বলেন,  চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। এবার এ কারণে চাহিদা বাড়বে, দামও ভালো হবে। ওয়েট ব্লু করা চামড়া দেশে দুই-আড়াই বছর রাখা যায়, ফলে গত বছরের চামড়াও রপ্তানি করা যাবে। যে কেউ চাইলে এ সুযোগ নিতে পারবে। দেশে জমে থাকা চামড়া এ সময়ের মধ্যে রপ্তানি হবে।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: