ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির পর তিন সপ্তাহ আগে বাড়ানো হয়েছে গণপরিবহন ভাড়া। এক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু নির্ধারিত এ ভাড়া মানছে না রাজধানীর গণপরিবহন মালিক ও চালকরা।
যাত্রীরা বলছেন জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে যে হারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে তাতে আমাদের আপত্তি ছিলনা। বাস্তবে আমাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত যাত্রীরা।
প্রতিদিনের যাতায়াতে বাড়তি ভাড়া তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এ বিষয়ে সরকাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন যাত্রীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে টানা দুই মাস দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ছিল। এ সংকটের কারণে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটে রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল কমে যায় অস্বাভাবিকহারে। এরপর সরকার কোনো উপায় না পেয়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। পরে বাস ভাড়া বাড়াতে সরকারকে চাপ দেয় গণপরিবহন মালিকরা।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কোথাও এ ভাড়া মানছে না মালিকপক্ষ। তারা যাত্রীদের কাছ অকে আরো বেশি ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। রাজধানীর উত্তরা থেকে গতকাল রামপুরায় একটি গণপরিবহনে এসেছেন রহিম শেখ নামের এক যাত্রী।
তিনি বলেন আগে এই যাত্রায় ভাড়া নেয়া হতো ৩৫-৪০ টাকা। কিন্তু এখন নেয়া হচ্ছে ৬০ টাকা। এছাড়া, গতকাল মহাখালি থেকে একটি পরিবহনে করে পল্টন মোড় এসেছেন আমিন খান নামের এক যাত্রী। তিনি বলেন নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর পর ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
উত্তরা থেকে গুলিস্তানগামী আরেক যাত্রী মানিক জানান, তেলের দাম বাড়ানোর পর ২০-২৫ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বশি নেওয়া হচ্ছে। যা সরকারি ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যাত্রীরা বলছেন, প্রতিবাদ করলে অনেক সময় বাসের স্টাফদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়তে হয়। এক পর্যায়ে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। তাই উপায় না পেয়ে তারা যা চাচ্ছে তাই দিতে হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন রুটের একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি রুটেই এভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কিছু বাস চালক বলছেন সরকার যে হারে ভাড়া বাড়িয়েছে তাতে আমাদের লোকসান হচ্ছে। কারণ তেলের দাম অনেক বাড়ানো হয়েছে। তাই আমরা যাত্রীদের থেকে একটু বেশি চেয়ে নিচ্ছি। তবে রাজধানীর বাইরে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটে সরকার নির্ধারিত বাস ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
নতুন ভাড়া কাঠামো অনুযায়ী রাজধানী থেকে টেকনাফ রুটে নন-এসি বাস ভাড়া বেড়েছে ৬৫ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ২৭০ টাকা, এখন হয়েছে ১ হাজার ৩৩৫ টাকা। একইভাবে ঢাকা থেকে পঞ্চগড় রুটে ভাড়া বেড়েছে ৬০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ১৮০ টাকা, এখন হয়েছে ১ হাজার ২৪০ টাকা। ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলোর ভাড়াও নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৭০৪ টাকা, রাজশাহীতে ৭৩৮ টাকা, খুলনায় ৬৮০ টাকা, বরিশালে ৫৯১ টাকা এবং সিলেটে ৭৪০ টাকা। এছাড়া রংপুরে যেতে এখন ৯১১ টাকা, ময়মনসিংহে ৩৩০ টাকা, কক্সবাজারে ১ হাজার ১৪৭ টাকা, কুমিল্লায় ৩০৬ টাকা এবং বগুড়ায় ৫৭৮ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘতম রুট দিনাজপুর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪৫৭ টাকা, যা আগে ছিল ২ হাজার ৩৪০ টাকা। এসব ভাড়া নির্ধারণে দূরত্ব, টোল, সেতু ও ফেরি খরচ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) হিসাব করে থাকে। এক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ভাড়া অনেকটা মানলেও জটিলতা তৈরি হয়েছে নগর পরিবহনে।
নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। যেখানে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ টাকা। ফলে অতিরিক্ত আদায় নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাড়ার এই সরকারি তালিকা ঘোষণা করা যতটা সহজ, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ততটাই চ্যালেঞ্জিং। কারণ স্বচ্ছ নজরদারি ও জবাবদিহির অভাবে যাত্রীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয়েছেন। যখনই জ্বালানির দাম সামান্য বাড়ে, পরিবহণ শ্রমিক ও মালিকদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে বহুগুণ বেশি ভাড়া আদায় শুরু করে। এবারও সেই পুরোনো নৈরাজ্য ফিরে এসেছে। ফলে এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির পর কার্যকর মনিটরিং না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, বাসে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমানভাবে টানানো এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া, ভুক্তভোগী যাত্রীরা যাতে দ্রুত অভিযোগ জানাতে পারেন, সেজন্য একটি কার্যকর হটলাইন ব্যবস্থা জোরদার করাও প্রয়োজন।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, বাস চালকদের বলা হয়েছে যাতে কেউ সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি না নেয়। তারপরেও কেউ বেশি ভাড়া নিলে আমাদের কাছে অভিযোগ আসলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।