দেশজুড়ে যেন ছড়িয়ে পড়েছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে নতুন কোনো হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি, অপহরণ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা প্রকাশ্য গুলির ঘটনা। কোথাও স্বামী হত্যা করছে স্ত্রী-সন্তানকে, কোথাও গরুচোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হচ্ছে মানুষ, আবার কোথাও সামান্য বিরোধ রূপ নিচ্ছে রক্তাক্ত সংঘর্ষে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, সহিংসতার ধরনও হয়ে উঠছে আরও নির্মম ও ভয়ংকর।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড দেশবাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে- গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা নতুন করে ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচারের ভয়াবহতা সামনে এনেছে। গত শনিবার স্থানীয়রা চোর সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করে রাতভর নির্যাতন চালায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনজনই মারা যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সন্দেহভাজন হলেও কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
এর আগেই গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন এক নারী, তার তিন শিশু কন্যা ও এক স্বজন। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব এবং আর্থিক টানাপোড়েন থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। ঘটনার পর থেকে নিহত নারীর স্বামী পলাতক রয়েছেন। পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ও সিআইডিও তদন্তে নেমেছে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ৯ বছরের শিশু আন্দালিব সাদমান রাফিকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনাও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধের জেরে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরে অভিযুক্তের বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিনের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনা শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে অভিভাবকদের মধ্যে।
খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে গৃহবধূ মাহিনুর আক্তারকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় গার্মেন্টসকর্মী বর্ষা আক্তারের গলাকাটা মরদেহ। দুই ক্ষেত্রেই পারিবারিক দ্বন্দ্বকে প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় ১১ বছর বয়সী এক শিশু, যে এখনও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছিল। প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে সহিংসতা। জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক আধিপত্য কিংবা মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে খুনোখুনি। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গণপিটুনির বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে চুরি, ছেলেধরা কিংবা ধর্ম অবমাননার গুজবকে কেন্দ্র করে।
৩ মাসে সারাদেশে ৮৫৪ খুন : পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ এবং মার্চে ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং গণপিটুনিতে মারা গেছেন অন্তত ৪৯ জন। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, তিন মাসে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
রাজধানীতেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুধু ঢাকাতেই ৫৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, বেকারত্ব এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে তরুণদের একটি অংশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে ভয় ও সহনশীলতার সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থা কমছে। তার মতে, গণপিটুনির মতো ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণও মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ সহিংসতার পেছনে রয়েছে পারিবারিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক অবসাদ এবং সামাজিক সহনশীলতার অভাব। তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকারী ভুক্তভোগীর খুব কাছের মানুষ। এটি সমাজের মানবিক সম্পর্কের ভয়াবহ ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সব আলোচিত হত্যাকাণ্ড গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, জামিনে বের হওয়া চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গতিবিধিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার করেছে এবং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্তে কাজ করছে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছে। প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে নতুন চারটি থানা ও কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার সম্প্রতি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরাধপ্রবণ এলাকার চাপ বিবেচনায় নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু পুলিশি অভিযান বাড়িয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক বন্ধন জোরদার, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। একই সঙ্গে গুজব প্রতিরোধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা। কারণ দেশের মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি যা চায়, তা হলো- নিরাপদ জীবন, আইনের শাসন এবং স্বস্তির পরিবেশ। কিন্তু একের পর এক খুন, গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় সেই প্রত্যাশা দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।