উদ্যোক্তা মিজান এক দশকে বদলে দিয়েছেন বরিশাল বিসিকের চিত্র

বরিশাল জেলা সংবাদদাতা

সারাদেশ

বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় ৬৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বিসিক শিল্প নগরী শিল্পঞ্চল হিসাবে পূর্নতা পায়নি। শ্রমিক কর্মমুখরতা ছিলনা সেখানে। একটি

2023-12-19T18:16:07+00:00
2023-12-19T18:16:07+00:00
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
উদ্যোক্তা মিজান এক দশকে বদলে দিয়েছেন বরিশাল বিসিকের চিত্র
বরিশাল জেলা সংবাদদাতা
মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩, ৬:১৬ পিএম 
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় ৬৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বিসিক শিল্প নগরী শিল্পঞ্চল হিসাবে পূর্নতা পায়নি। শ্রমিক কর্মমুখরতা ছিলনা সেখানে। একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরী বাদে দেশের মধ্যে একনামে পরিচিতি, এমন কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিলনা। এক দশক আগ পর্যন্ত ছিল এই অবস্থা। সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ৫০০ শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান ছিলনা বরিশাল বিসিকে। সেই বিসিকের পরিচয় এখন দেশ ছাপিয়ে বিদেশে ছড়িয়েছে ‘ফরচুন সুজ’ নামক জুতা উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠান। শতভাগ রপ্তানীমুখী বরিশালের একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান এটি। এই একটি প্রতিষ্ঠানেই শ্রমিক রয়েছে ৬ সহস্রাধিক। তাদের পদচারনায় মুখর থাকে বরিশাল বিসিক শিল্পাঞ্চল। 

২০১২ সালে ৪৭২জন কর্মী নিয়ে বরিশালে যাত্রা শুরু ফরসুন সুজ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের। ১১ বছরের ব্যবধানে সেটির পরিচয় ফরচুন গ্রুপ। বরিশাল ও ঢাকায় মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান। ১২ সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। বরিশালে রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা চালানো যায় তা প্রমান দিয়েছেন ফরচুন সুজের উদ্যোক্তা মো. মিজানুর রহমান। মাত্র ১১ বছরে বদলে দিয়েছেন বরিশাল বিসিকের চিত্র। 

২৭ বছর আগে ‘৯৬ সালে জীবিকার তাগিদে পড়াশোনার পাশাপাশি জুতা কারখানার চাকুরী নিয়েছিলেন। সেই মিজানুর রহমান নিজে ১০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। দেশের জন্য আনছেন বৈদিশিক মুদ্রা। তরুন বয়সে লড়েছেন স্ববলম্বী হওয়ার জন্য। এখন লড়ছেন সমাজ বদলাতে। মিজানুর বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আব্দুল আজিজ খানের ছেলে। চট্রগ্রামে লেখাপড়া করতে গিয়ে সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পড়ে নাড়ির টানে বরিশালে ফিরে শিল্প কারখানা গড়েছেন। 

মিজানুর রহমান ‘৯৬ সালে চট্ট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন। প্রথমবর্ষে ছাত্র থাকাবস্থায় বাবার আকস্মিক মৃত্যু তার সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। ছোট চার ভাইয়ের লেখাপড়া ও সংসারের দায়িত্ব পড়ে বড় ছেলে মিজানুরের ওপর। পরিস্থিতি সামাল দিতে টিউশনি ছেড়ে চট্টগ্রামে একটি জুতা কারখানায় চাকুরী নেন। পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান। পরে চাকুরীর পাশাপাশি দরজার তালাসহ বিভিন্ন সরঞ্জামদী আমদানীর ব্যবসা শুরু করেন। এ থেকে সঞ্চিত অর্থে ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে একটি এমব্রয়ডারি কারখানা করে উদ্যেক্তা মিজানুরের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৮ সালে জুতা কারখানার চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে জুতার কারখানা করেন। দেড় বছর পর যৌথ মালিকানার ব্যবসা ভেঙ্গে গেলে এককভাবে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। 

বড় বিনিয়োগে কিছু করতে নিজের জন্মস্থান বরিশালকে বেছে নেন। উদ্দেশ্য ছিল দুটি- ব্যবসা ও এলাকার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তখন বরিশালে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। রাজধানীতে যেতে ফেরী দূর্ভোগসহ ৮-১০ ঘন্টা সময় লাগতো। পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপন নিয়ে সবেমাত্র আলোচনার শুরু হয়েছে। এমন প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে বরিশাল বিসিকে ২০১২ সালে ফরসুন সুজের যাত্রা শুরু হয়। কর্মী ছিল ৪৭২ জন। গত ১১ বছরে একে একে আরও ৫টি কারখানা করেছেন। ছয়টি কারখানার তিনটি বরিশালে। অপর ৩টি ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে। বরিশালের ৩টি প্রতিষ্ঠানে এখন কর্মীর সংখ্যা ৫ সহস্রাধিক। যার মধ্যে ৭০ ভাগই নারী। 

ফরচুন গ্রুপের কারখানাগুলো হচ্ছে, ফরচুন সুজ, প্রিমিয়ার ফুটওয়্যার, ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি, সিন ইন ফুটওয়্যার টেকনোলজি, এমজে ইন্ড্রাষ্ট্রিজ ও পশ ফুটওয়ার। এছাড়া জুতা তৈরীর বিভিন্ন সরঞ্জাম উৎপাাদনের ৫টি কারখানা রয়েছে। দৈনিক গড়ে ৫০ হাজার জোড়া চামরাবিহীন জুতা তৈরী হয় ফরচুন গ্রুপের কারখানায়।  

জুতা রপ্তানি হচ্ছে স্পেন, জার্মানী, ইতালী, পোলান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে। ফিলা, ডিজনি, ডিচম্যান, স্লাজেঞ্জার, জেমো, মার্কেল, আস্ত্রো, এয়ারনেস, ষ্টিভ ম্যাডেন, ডানলপ, রেডটপ, লিডল, বন্ড ষ্ট্রিট, প্রাইমার্কের মতো ইউরোপ-আমেরিকার খ্যাতনামাক ব্রান্ড জুতা তৈরী হয় ফরচুনের কারখানায়। এশিয়ার সেরা ২০০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নাম উঠেছে ফরচুন নামক জুতা কোম্পানীর। কোম্পানী চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ২০১৮ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ তরুন শিল্পদ্যেক্তার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। 

ফরচুনে যা কিছু ব্যতিক্রম : নারীদের সহজ কর্মসংস্থান গার্মেন্টস কারখানা এ ধারনাকে বদলে দিয়েছে ফরচুন গ্রুপ। এখানে কর্মরত মোট শ্রমিকের ৭০ ভাগই নারী। শ্রমিকদের বড় অংশের বাড়ি বাবুগঞ্জ উপজেলায়। এই উপজেলার চাঁদপাশা গ্রামে জন্মেছেন কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমানের। কর্মস্থলে আসায়াওয়ার সুবিধায় করা হয়েছে বাসের ব্যবস্থা। বাবুগঞ্জে উপজেলার মীরগঞ্জ ও শিকারপুর এবং বানারীপাড়া উপজেলা ও সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ থেকে কর্মীদের কর্মস্থলে আনতে মালিকপক্ষের রয়েছে ১৫টি বাস। ফরচুনে চাকুরী প্রদানে অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়না। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান দেওয়া হয় মানবিক বিবেচনায়। এরকম কর্মীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। 

শারিরীক প্রতিবন্ধী কর্মী মো. রাসেল বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর বরিশালের একটি খ্যাতনামা ওষুধ প্রস্তুত কারখানায় চাকুরীর জন্য গিয়েছিলেন। শারীরিক কারনে তাকে নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালে ফরচুন প্রতিষ্ঠার পরের বছর বিজ্ঞপ্তির দেখে আবেদন করলে তার চাকুরী হয়। 

তরুনী গৃহবধু মালা আক্তার চাকুরী করতেন ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে। স্বামীর বাড়ি বরিশালে নগরীর কাউনিয়া এলাকায়। চলতি মাসে তিনি ফুরচুন সুজে শ্রমিক পদে যোগ দিয়েছেন। মালা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি না থাকলে আমার বরিশালে আসা হতো না। 

কোম্পানীর উপ মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কম্পাউজন্ড) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, অনভিজ্ঞ শ্রমিক নিয়োগের পর উন্নত প্রশিক্ষন দিয়ে প্রত্যেক শ্রমিককে দক্ষ গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি কারখানায় রয়েছে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা। ৫ বছর পর কোন কর্মী চাকুরী ছেড়ে গেলে ভবিষ্যত তহবিলের দ্বিগুন অর্থ পরিশোধ করা হয়। শ্রমিকদের শুরুতে নিয়োগকালীন বেতন দেওয়া হয় ৭ হাজার ১০০ টাকা। যা বরিশালের অন্যসব কোম্পানীর তুলনায় সর্বাধিক।   

প্রতিকুল পরিবেশই ৫ বছর : স্থানীয় প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে দ্বন্দের জেরে গত ৫ বছর বরিশালে ফরচুন গ্রুপকে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। প্রভাবশারী ওই নেতার অনুসারীরা একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা-ভাংচুর করেছে। জানা গেছে, বিসিকে ৭৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়ে রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হন বিসিক শিল্প মালিক সভাপতি ও ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান। ফলে ৫ বছরে বিসিক ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স দেয়নি সিটি করপোরেশন। 

ফরচুনের উপ মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ, প্রশাসন ও কম্পাউজন্ড) মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ফরচুন গ্রুপের ৬টি প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান আজিজ ফুটওয়্যার, বাংলাদেশ সুজ, প্রিমিয়ার আউটসোল্ড প্লান্ট, আনা এমজে ফোম, ফরচুন ক্যাবল ও তালহা টেক্সটাইল’র ট্রেড লাইসেন্স আবেদন আটকে রেখেছে বিসিসি। প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যেতে পারলে আরও ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। খুলনার দৌলতপুরে একটি রাষ্ট্রীয় জুট মিল কিনে সেটি উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্ততি চলছে বলে জানান শহীদুল। 

জীবনযাপনেও ব্যতিক্রম : চীনে ফরচুনের নিজস্ব অফিস রয়েছে। দেশ-বিদেশ যেখানেই থাকেন অফিস তদারকি করেন মিজানুর রহমান নিজেই। এছাড়া আমেরিকা ও লন্ডনসহ ইউরোপের বেশীরভাগ দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তিনি। ওইসব দেশে যখন দিন, তখন রাত হয় বাংলাদেশে। মিজানুরকে রাত জেগেই বিদেশী দপ্তরগুলো তদারকি করেন। 

এর ব্যখ্যা দিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, চীনে দিন শুরু হয় বাংলাদেশের আগে। ওখানকার অফিসে যোগাযোগের জন্য সকাল ৭টার মধ্যে কাজ শুরু করতে হয়। তাই নাশতা করতে করতেই কাজ শুরু করে দেন। আবার আমেরিকায় যোগাযোগ করতে হয় বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায়। এই সময়ের কাছাকাছি যোগাযোগ করতে হয় লন্ডনের অফিসে। ফলে ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু থাকেনা। স্ত্রী রোকসানা রহমান ও সন্তানরা বিষয়টি মানিয়ে নিয়েছেন। 

এতকিছুর পরেও মিজানুর রহমান একজন ক্রীড়ামোদী। ক্রিকেটে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) ফ্রাঞ্চসিজ টিম ফরচুনের স্বত্বাধীকারি তিনি। পাশাপাশি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্রিকেট টিমের চেয়ারম্যান। 

ফরচুনের অর্জন : ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজনেস ম্যাগাজিন ফোবর্সের এশিয়ার ২০০ বেষ্ট আন্ডার আ বিলিয়ন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় বাংলাদেশের শীর্ষ তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বরিশালের ফরচুন সুজ। এছাড়া ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু শিল্প পুরস্কারে প্রথম স্থান অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বৃহৎ শিল্প লেদারখাতে ফরচুন গ্রুপ ন্যাশনাল প্রোডাকটিবিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি এক্সিলেন্স অ্যাডওয়ার্ড- ২০২১ পদক পেয়েছেন।



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: