জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি পাস্তুরিত দুধ, আটা-ময়দা ও কিছু ফলের দামও বেড়েছে। তবে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও চালের দামে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এর পর থেকেই পরিবহন ব্যয় বাড়ার কথা জানিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।
১০-২০ টাকা বেড়েছে সবজির দাম
রাজধানীর মিরপুর-১, মিরপুর-১১, শেওড়াপাড়া, তালতলা, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে।
লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। এক সপ্তাহ আগে একই ধরনের বেগুনের দাম ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা। করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, যা কিছুদিন আগে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে ছিল।
পটোল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এছাড়া ঝিঙা, ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
তবে বাজারভেদে কিছু পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা কিংবা কমতির চিত্রও দেখা গেছে। পেঁপে ২০ থেকে ৩০ টাকা, আলু ৩০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও বাজারভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজির মধ্যে রয়েছে।
ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৩ হাজার টাকা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দূরবর্তী জেলা থেকে রাজধানীতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই।
ব্যবসায়ী মিজান জানান, যশোর থেকে কারওয়ান বাজারে বেগুন আনা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এখন একই ট্রাকের ভাড়া বেড়ে প্রায় ২১ হাজার টাকা হয়েছে।
মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই সবজির দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় যতটা বেড়েছে, অনেক পণ্যের খুচরা দাম তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে।
ইলিশে কিছুটা স্বস্তি
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ইলিশের বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সরবরাহ বাড়ায় গত সপ্তাহের তুলনায় ইলিশের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা কেজি দরে। গত সপ্তাহে একই আকারের ইলিশের দাম ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা।
৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি। ছোট আকারের ইলিশ মিলছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে।
মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদীতে ইলিশ ধরা পড়ার হার বেড়েছে এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় দাম কমেছে।
ডিম-মুরগি ও চালে বড় পরিবর্তন নেই
সব পণ্যের দাম বাড়েনি। ফার্মের ডিম গত সপ্তাহের মতোই প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সোনালি মুরগি ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি প্রায় ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চালের দামেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
দুধ, আটা-ময়দাতেও বাড়তি চাপ
নিত্যপণ্যের তালিকায় নতুন করে বেড়েছে পাস্তুরিত তরল দুধের দাম। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও একই হারে দাম বাড়িয়েছিল।
এদিকে আটা ও ময়দার দামও আগের তুলনায় বেশি। প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি প্রায় ৭০ টাকা এবং ময়দা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও এসব পণ্যের দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা।
খোলা আটা ও ময়দার দামও কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৫ টাকা করে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজার নজরদারি বাড়ানোর কথা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নজরদারির কথা জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দামে যতটুকু প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ ব্যবসায়ীদের দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, পরিবহন ভাড়া ও পণ্যমূল্যের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাজারে নজরদারি আরও কঠোর করা হবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রকৃত প্রভাব কোন পণ্যে কতটা পড়ার কথা, সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এতে ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ কম পাবে এবং বাজার তদারকিও আরও কার্যকর হবে।