আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দেশেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

স্বাস্থ্য

প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিনিয়তই বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে। জীবন যাপনকে অতীতের থেকে সহজ ও আরামদায়ক করছে প্রযুক্তির পরশ পাথরের ছোঁয়া। বিশেষ করে

2026-07-29T12:15:16+00:00
2026-07-29T12:17:20+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির বিকাশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সরকারের
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দেশেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম  আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ১২:১৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিনিয়তই বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে। জীবন যাপনকে অতীতের থেকে সহজ ও আরামদায়ক করছে প্রযুক্তির পরশ পাথরের ছোঁয়া। বিশেষ করে চিকিৎসায় প্রযুক্তির ব্যবহার অতীতের যে কোনো সময়ের থেকে স্বাস্থ্যসেবাকে করেছে জটিলতা ও ঝামেলামুক্ত। এছাড়াও দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন মেশিন যন্ত্র সফলভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ব্যবহারে স্বাস্থ্যসেবা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তার বিভিন্ন মডেল বাংলাদেশেও বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে গ্রামে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রযুক্তির বিকাশিত ছোঁয়া কার্যকর ভূকিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি দেশীয় প্রযুক্তিতে জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেটর এবং হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন তৈরি করা হয়েছে। যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ ও কম খরচে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে। 

মঙ্গলবার (জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। 

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মান যাচাই এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।’ সভায় সংশ্লিষ্টরা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুটি চিকিৎসা যন্ত্রের কার্যকারিতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশে সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। 

দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন  ব্যবহার উপযোগী ও বাজারজাত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে দেশের আলাদা দুটি বিশেষজ্ঞ দল ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এগুলো দেশের সব হাসপাতালে ব্যবহারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় যন্ত্র দুটি তুলনামূলক কম খরচে বাজারজাত করা সম্ভব হবে, যা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে ভূমিকা রাখবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, ভেন্টিলেটর মেশিনটি গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম। এ কারণে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। 

অন্যদিকে হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিনটি শ্বাসতন্ত্রের সাধারণ সমস্যাজনিত রোগীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী। এই যন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। ফলে বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত এলাকা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহনের সময় অ্যাম্বুলেন্সেও এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। 

চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নিত্যনতুন প্রযুক্তির বিষয়ে জানা থাকতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমৃদ্ধির ও কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। নতুন যে পদ্ধতিই আসুক না কেন রোগীর জন্য যেটা সর্বোত্তম, সেই পদ্ধতিই ব্যবহার করতে হবে। আমাদের সম্পর্ক হলো রোগীর সাথে, রোগীর স্বার্থই আমাদের কাছে মুখ্য বিষয়।’

কোভিডের অভিজ্ঞতা থেকে আরও দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে রোগী ও চিকিৎসক-হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষ করে ভিডিও কল করার সুবিধা সংবলিত অ্যাপসগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎকরা সহজেই দূরে থেকেও তাদের রোগীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখতে পেরেছেন। যা তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়ার বিষয়টিকে আরও সহজ করে তোলে। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যবর্তী দূরত্বের ক্ষেত্রে এমনকি ঘুচে গেছে সীমান্তরেখা পর্যন্ত। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এক দেশ থেকে আরেক দেশে থাকা রোগীর পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে সক্ষম হয়েছেন চিকিৎসকরা।

রোগীদের তথ্য জানাচ্ছে ডিজিটাল মেডিকেল রেকর্ড: স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির আরেকটি যুগান্তকারী সংযোজন হলো ইলেক্ট্রনিক হেলথ রেকর্ডস বা ইএইচআর পদ্ধতি। এর মাধ্যমে একজন রোগীর প্রায় সব ধরনের তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ফলে ওই রোগী যেখানেই যে চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা নেন না কেন, তার অতীতের রোগ সংক্রান্ত সব তথ্য চলে যাচ্ছে তার বর্তমান চিকিৎসকের কাছে। এর ফলে ওই রোগীর রোগ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জেনেশুনে চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেন চিকিৎসকরা। 

ইএইচআর পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হয় রোগীর প্রেসক্রিপশন, তার বিভিন্ন ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট, অতীতের অস্ত্রোপচার, হাসপাতালে অবস্থানের রেকর্ডসহ তিনি কী কী ওষুধ খেয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ। একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় যথাযথভাবে এই ইএইচআর পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানোর মাধ্যমে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব।  

তথ্যমতে, ডিজিটাল রেকর্ডের মাধ্যমে একজন রোগীর চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ল্যাব টেকনিশিয়ানদের মধ্যেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন সম্ভব। এর মাধ্যমে চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমিয়ে আনার মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয়ে সাশ্রয় করার পাশাপাশি চিকিৎসায় অবহেলাও হ্রাস করার সম্ভব। 
ইএইচআর পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে একজন রোগীর রোগ নির্ণয় অপেক্ষাকৃত কম সময়েই সম্ভব হয়, এবং তাদের রোগ ও চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করাও সহজসাধ্য। এই পদ্ধতি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের চিকিৎসা দেয়ার কাজকে সহজ করে এবং তাদের ভুল করার হার কমিয়ে আনার মাধ্যমে রোগীদের জীবনকে আরও সহজ করে তোলে।

মানুষকে রোগ সম্পর্কে সচেতন করছে তথ্যপ্রযুক্তি: বর্তমানে বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতেই রয়েছে মোবাইল ফোন কিংবা স্মার্টফোন।

যেখানে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। এর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা ও স্বাস্থ্যসেবার সর্বশেষ বিভিন্ন আপডেট জানতে পারছেন সাধারণ মানুষ। ফলে তাদের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার প্রবণতা। 

স্বাস্থ্যসেবায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ। তারা সহজেই বিভিন্ন রোগের ব্যাপারে তথ্য সহ স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনে দূরে থাকা চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হচ্ছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের দেশ। সারা দেশে প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তোলা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ভৌত অবকাঠামো দিক বিবেচনা করলে এটা নিঃসন্দেহে ভালো সাফল্য। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না সেবার নিম্নমান ও দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে। 

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় বাস্তবি ভালো সুফল পেতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহারই আপাত সমাধান। এরই মধ্যে আইএমসিআই ডিজিটাল অ্যাপ প্রমাণ করেছে, যে অল্প বিনিয়োগ ও কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা সম্ভব। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল রূপান্তরই বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সবচেয়ে স্মার্ট, সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।


Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: