ক্রিকেটের বাইরে ফুটবল, শুটিং ও অন্যান্য খেলার বাণিজ্যিকীকরণ

ভোরের ডাক ডেস্ক

কর্পোরেট কর্নার

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কথা উঠলেই প্রথমেই আসে ক্রিকেটের নাম। এটি স্বাভাবিকও। গত দুই দশকে ক্রিকেট শুধু একটি জনপ্রিয় খেলাই নয়, বরং

2026-07-09T12:30:22+00:00
2026-07-09T13:44:23+00:00
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
কর্পোরেট কর্নার
বাংলাদেশের ক্রীড়া অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
ক্রিকেটের বাইরে ফুটবল, শুটিং ও অন্যান্য খেলার বাণিজ্যিকীকরণ
ভোরের ডাক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম  আপডেট: ০৯.০৭.২০২৬ ১:৪৪ পিএম
সাকিফ শামীম চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইকোনোমিক রিসার্চ ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপ
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কথা উঠলেই প্রথমেই আসে ক্রিকেটের নাম। এটি স্বাভাবিকও। গত দুই দশকে ক্রিকেট শুধু একটি জনপ্রিয় খেলাই নয়, বরং দেশের অন্যতম সফল ক্রীড়া অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। 

সম্প্রচারস্বত্ব, করপোরেট স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন, খেলোয়াড়দের ব্র্যান্ড ভ্যালু, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং দর্শকসংস্কৃতি, সব মিলিয়ে ক্রিকেট আজ একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প। কিন্তু একটি দেশের ক্রীড়া উন্নয়ন কি একটি মাত্র খেলার ওপর নির্ভর করতে পারে? 

বিশ্বের যেসব দেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করেছে, তারা কখনোই একটি খেলার ওপর নির্ভর করেনি। তারা জনপ্রিয় খেলা ও অলিম্পিকভিত্তিক খেলাকে আলাদা কৌশলে উন্নয়ন করেছে। 

কারণ তারা জানে, কিছু খেলা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, আবার কিছু খেলা আন্তর্জাতিক মর্যাদা এনে দেয়। বাংলাদেশেরও এখন সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার সময় এসেছে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি ক্রীড়া নীতি, যেখানে ক্রিকেট থাকবে দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক খেলা হিসেবে, ফুটবল হবে ক্রীড়া অর্থনীতির পরবর্তী প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি এবং শুটিং হবে বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিক পদক জয়ের জাতীয় মিশন। 

ক্রিকেট আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট অংশীদারিত্ব একটি খেলাকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে। আজ দেশের প্রায় প্রতিটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ক্রিকেটে বিনিয়োগ করে। এই বিনিয়োগকে তারা আর শুধুমাত্র করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর হিসেবে দেখে না; বরং এটি ব্র্যান্ড নির্মাণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক সম্পৃক্ততার কার্যকর মাধ্যম। প্রশ্ন হলো, ফুটবল কি এই পথ অনুসরণ করতে পারে? আমার উত্তর, অবশ্যই পারে। 

বাংলাদেশে ফুটবলের দর্শকসংখ্যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বকাপ এলেই দেশের কোটি মানুষ ফুটবল নিয়ে উন্মাদনায় মেতে ওঠে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলও বাংলাদেশে বিপুল দর্শক আকর্ষণ করে। অর্থাৎ বাজার রয়েছে, দর্শক রয়েছে, আবেগ রয়েছে। যা প্রয়োজন, তা হলো এই আগ্রহকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া। 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ফুটবলে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণও স্পষ্ট। নারী ফুটবলের ধারাবাহিক সাফল্য, বয়সভিত্তিক দলের উন্নয়ন, প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং ফুটবলকে ঘিরে তরুণদের অসীম আগ্রহ, সব মিলিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া গেলে আগামী দশকে ফুটবল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রীড়া শিল্পে পরিণত হতে পারে। তবে, এরজন্য শুধু লীগ আয়োজন করলেই বাণিজ্যিকীকরণ হবে না। বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে হবে ব্যবসায়িক চিন্তায়। 

প্রথমত, ক্লাবগুলোকে স্থানীয় পরিচয়ের শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত করতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা কিংবা বরিশালের ক্লাবগুলোকে নিজস্ব সমর্থকভিত্তি, ডিজিটাল কনটেন্ট, মার্চেন্ডাইজ, সদস্যপদ এবং কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচালিত করতে হবে। একজন সমর্থককে শুধু দর্শক হিসেবে বিবেচনা না করে একজন দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক হিসেবেও দেখা উচিত। 

দ্বিতীয়ত, স্টেডিয়ামকে কেবল ম্যাচ আয়োজনের জায়গা হিসেবে দেখা যাবে না। বিশ্বের বড় বড় ক্লাবগুলো স্টেডিয়ামকে বিনোদন, পর্যটন, জাদুঘর, করপোরেট অনুষ্ঠান, রেস্তোরাঁ এবং খুচরা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের স্টেডিয়ামগুলোও বছরে কয়েকটি ম্যাচের পরিবর্তে সারা বছর আয়ের উৎস হতে পারে। 

তৃতীয়ত, ডিজিটাল উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণ প্রজন্ম আজ মোবাইল ফোনেই খেলা দেখে। তাই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, শর্ট ভিডিও, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, ক্লাবভিত্তিক ডকুমেন্টারি, সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক কনটেন্ট এবং ডিজিটাল ফ্যান কমিউনিটি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্পোর্টস সায়েন্সকে ক্লাব পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আধুনিক ফুটবল এখন প্রযুক্তি, তথ্য এবং ব্যবসার একটি সমন্বিত শিল্প। 

চতুর্থত, তৃণমূল উন্নয়নকে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নিয়মিত লীগ, জেলা পর্যায়ের একাডেমি এবং প্রতিভা অনুসন্ধান কর্মসূচি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন ফুটবলার তৈরি সম্ভব নয়। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা একাডেমির দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারে। এতে খেলোয়াড় যেমন তৈরি হবে, তেমনি ব্র্যান্ডের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। 

তবে বাংলাদেশের ক্রীড়া নীতিতে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি প্রয়োজন, তা হলো অলিম্পিকভিত্তিক খেলাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা। 

আমরা প্রায়ই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে বিনিয়োগের কথা বলি, কিন্তু অলিম্পিকে পদক জয়ের সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিনিয়োগের আলোচনা খুব কমই করি। 

বাংলাদেশ ১৯৮৪ সাল থেকে নিয়মিত অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করলেও এখনও একটি পদক জিততে পারেনি। এই বাস্তবতায় আমাদের উচিত সেই খেলাগুলো চিহ্নিত করা, যেখানে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আমার মতে, এই জায়গায় শুটিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমনওয়েলথ গেমস এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের বহু উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে শুটিং থেকে। এই খেলায় সফলতার জন্য উচ্চতা, শারীরিক শক্তি বা বিশাল অবকাঠামো নয়; প্রয়োজন নিখুঁত প্রশিক্ষণ, মানসিক দৃঢ়তা, চুড়ান্ত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচিং। 

এ কারণেই অনেক ক্রীড়া বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিক পদক জয়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা এখনও শুটিংয়েই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই খেলাটি এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পায়নি। যদি সরকার, জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন এবং বেসরকারি খাত যৌথভাবে একটি জাতীয় শুটিং একাডেমি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, করপোরেট স্কলারশিপ এবং আধুনিক সরঞ্জাম বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ অলিম্পিকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। অনেকেই মনে করেন, ক্রীড়ায় বিনিয়োগ মানেই ব্যয়। বাস্তবে এটি একটি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ। 

একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শিল্প শুধু খেলোয়াড় তৈরি করে না; এটি তৈরি করে কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, ভিডিও বিশ্লেষক, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, কনটেন্ট নির্মাতা, ইভেন্ট ম্যানেজার, ডিজিটাল মার্কেটার, সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ এবং হাজারো নতুন কর্মসংস্থান। 

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে পর্যটন, হোটেল, পরিবহন এবং স্থানীয় ব্যবসাও লাভবান হয়। বাংলাদেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখন নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। 

ক্রিকেটে বিনিয়োগের যে সফল মডেল তৈরি হয়েছে, তার অভিজ্ঞতা ফুটবল ও শুটিংয়েও প্রয়োগ করা সম্ভব। করপোরেট অংশীদারিত্ব শুধু স্পন্সরশিপে সীমাবদ্ধ না রেখে একাডেমি, যুব উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং খেলোয়াড় উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিস্তৃত করতে হবে। 

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্পষ্ট, ক্রিকেট বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক খেলা হিসেবে এগিয়ে যাবে; ফুটবল হবে দেশের পরবর্তী ক্রীড়া অর্থনৈতিক বিপ্লবের ভিত্তি; আর শুটিং হবে বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিক পদক জয়ের জাতীয় অগ্রাধিকার। 

একটি দেশের ক্রীড়া শক্তি পরিমাপ করা হয় আন্তর্জাতিক সাফল্য, অর্থনৈতিক অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হওয়া সুযোগ দিয়ে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। এখন প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, পেশাদার পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। 

কারণ জনপ্রিয়তার বাইরে গিয়ে সম্ভাবনাকে চিনতে পারলেই ক্রীড়া হতে পারে দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি।


Loading...
Loading...

কর্পোরেট কর্নার- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: