বিশ্ব ফুটবলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক তারকার ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা। অভিযোগ উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পরই বদলে যায় পরিস্থিতি এবং শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ফিফা। এ ঘটনাকে ঘিরে ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ট্রাম্পের প্রভাবেই কি ফিফা সিদ্ধান্ত বদলেছে, নাকি এর পেছনে ছিল অন্য কোনো কারণ—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে ফিফা। তবে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থার এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পেছনে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের আইনি চাপ কাজ করেছে বলে দাবী করেছে মার্কিন গণমাধ্যম 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৬২ সালের পর এই প্রথম কোনো খেলোয়াড়ের লাল কার্ডজনিত স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা এভাবে বাতিল বা স্থগিত করার ঘটনা ঘটল।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, গত বুধবার ম্যাচটি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরাসরি ফোন করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বালোগুনের লাল কার্ডের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য ইনফান্তিনোকে অনুরোধ জানান।
শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক এবং হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি দ্রুত আইনজীবীদের নিয়োজিত করেন। তারা মার্কিন সকার ফেডারেশনকে ফিফার এই ‘আপিল অযোগ্য’ নিয়মের বিরুদ্ধে আপিল করার একটি বিশেষ খসড়া বা আইনি পথ তৈরি করে দেন।
আইনি নোটিশে যুক্তি দেওয়া হয় যে, রেফারি স্লো-মোশন রিপ্লে দেখে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়াও, মার্কিন সকারের এক শীর্ষ দাতা ও হেজ ফান্ড ম্যানেজার স্কট গুডউইন ট্রাম্প প্রশাসনকে জানান যে, ওই ম্যাচের ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউসের বিরুদ্ধে অতীতে ব্রাজিলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের (অন্যায়ভাবে লাল কার্ড দেওয়ার) অভিযোগ উঠেছিল। যদিও ফিফা বা ব্রাজিলিয়ান কর্তৃপক্ষ ক্লাউসের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায়ের প্রমাণ পায়নি, তবে ট্রাম্প ইনফান্তিনোর সাথে ফোনালাপে এই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগের বিষয়টিও তোলেন।
রবিবার বালোগুনকে খেলার অনুমতি দেওয়ার পরপরই ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো আবার ফোনে কথা বলেন এবং ট্রাম্প একে ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ বলে প্রশংসা করেন। ট্রাম্প মার্কিন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোকেও ফোন করে শুভকামনা জানান। আর প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, 'সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অবিচারের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!'
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবারই এমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি গারিনচা সেমিফাইনালে লাল কার্ড পেয়েছিলেন। সে সময় ব্রাজিলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তানক্রেদো নেভেসের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফিফা গারিনচাকে ফাইনালে খেলার অনুমতি দিয়েছিল। দীর্ঘ ৬৪ বছর পর ট্রাম্পের হাত ধরে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
প্রকৃতপক্ষে, জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। গত ডিসেম্বরে ফিফা ট্রাম্পকে তাদের তৈরি করা প্রথম ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করে। ইনফান্তিনোর এই রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ফিফার এথিক্স কমিটিতে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম ও আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি : ফিফার এই পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন। তারা এক বিবৃতিতে জানায়, ফিফা তাদের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধি এবং টুর্নামেন্টের আগে দলগুলোকে দেওয়া নির্দেশিকার সম্পূর্ণ পরিপন্থী কাজ করেছে। বেলজিয়াম এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত সহ সম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখছে।
ফুটবল মহলের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হলো, যার ফলে এখন থেকে যেকোনো প্রভাবশালী দেশই তাদের খেলোয়াড়দের নিষেধাজ্ঞা তুলতে ফিফার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
সব বিতর্ক পাশ কাটিয়ে, সোমবার রাতে সিয়াটলে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হচ্ছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ৩ গোল করা প্রধান স্ট্রাইকার বালোগুনকে ফিরে পেয়ে মার্কিন দল চাঙ্গা হলেও, এই ঘটনা মাঠের বাইরের ফুটবল রাজনীতিকে এক চরম বিতর্কের মুখে ঠেলে দিল।