৫৪ বছরে বাস্তুচ্যুত ২০ লাখ ২০ হাজার মানুষ

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

বর্ষার পানি নামতে শুরু করলেই শুরু হয় তীব্র নদী ভাঙন। নদীমাতৃক এই দেশে নদী যেমন জীবন ও জীবিকার উৎস, তেমনি

2026-06-29T11:45:59+00:00
2026-06-29T12:56:02+00:00
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ভিটেমাটি হারানোর মিছিল বড় হচ্ছে
৫৪ বছরে বাস্তুচ্যুত ২০ লাখ ২০ হাজার মানুষ
সুমন হাওলাদার
সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম  আপডেট: ২৯.০৬.২০২৬ ১২:৫৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
বর্ষার পানি নামতে শুরু করলেই শুরু হয় তীব্র নদী ভাঙন। নদীমাতৃক এই দেশে নদী যেমন জীবন ও জীবিকার উৎস, তেমনি হাজারো মানুষের জন্য তা হয়ে উঠে সর্বনাশের কারণ। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি এবং উজানের প্রবাহের প্রভাবে নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে প্রতিবছর নতুন করে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে হাজারো পরিবার।

নদী গবেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালে পদ্মা নদীর গতিপথ আরো বেশি পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে। নদীটি এখন আগের তুলনায় বেশি আঁকাবাঁকা ও বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রভাবেও নদীর গতিপথ ও গঠন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালে পদ্মার ভাঙন নিয়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস আর্থ এক্সপ্লোরারের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২০ বছরে পদ্মা সেতু সংলগ্ন এলাকায় ১৫৫ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা বা ১৫ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন চর জেগেছে ১২৫ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার বা ১২ হাজার ৫২০ হেক্টর। অর্থাৎ এ সময়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা বা ৩ হাজার ৪০ হেক্টর জমি স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের পর নদীভাঙনের চেয়ে চর জাগার পরিমাণ বেড়ে যায়। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল-এ পাঁচ বছরে নদীতে নতুন চর জেগেছে ৭৮ দশমিক ৭১ বর্গকিলোমিটার। বিপরীতে নদী ভেঙেছে ৬৮ দশমিক ৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অর্থাৎ এ পাঁচ বছরে নদীতে নতুন করে প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটারের মতো চর বা ভূমি যুক্ত হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণকালের আগের পাঁচ বছরে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ সময়ে নদীটি ভেঙেছে ৮১ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার এবং চর জেগেছে ৭৬ দশমিক ২১ বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে ভাঙন বেশি হওয়ায় নদীটি আরো চওড়া হতে থাকে। অর্থাৎ নদীর আয়তন প্রায় ৫ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার বেড়ে যায়। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নদীটি প্রায় শান্তই ছিল। এ পাঁচ বছরে পদ্মা ভাঙে ৭৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং চর জাগে ৮০ দশমিক ৩১ বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে নদীটি ৪ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার সংকুচিত হয়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং নদী ও পানিসম্পদ গবেষক ড. আইনুন নিশাত বলেন, নদী ভাঙবে এটাই চরিত্র। এ ভাঙন রোধ করতে চাইলে নদীর দুই পাশেই শাসন করতে হবে। আর নদীর ভাঙন কখনো নিয়ম মেনে হয় না। তবে পদ্মা সেতুর নদী শাসন এলাকা আর ভাঙবে না।

 তিনি আরো বলেন, নদীভাঙন রোধে সরকার প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে নদীর তীর রক্ষায় ও বাঁধ নির্মাণে প্রচুর অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগ অনুপাতে সুফল পাওয়া যায়নি। সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং অনিয়ম দুর্নীতির ফলে নদী রক্ষায় যেসব বাঁধ নির্মাণ করা হয় সেগুলো মজবুত হয় না। ফলে প্রতি বছরই বাঁধ ভাঙে, আবার তা মেরামত করা হয়। এতে প্রচুর অর্থ খরচ হলেও নদীভাঙন রোধে খুব একটা কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।

নদী গবেষক এআরএম খালেকুজ্জামান বলেন, ২০২১ সালে নদী রক্ষা কমিশনের সঙ্গে ৫৭টি নদীর মরফোলজি স্টাডি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।  নদীর স্রোতের একটি স্বাভাবিক প্রবাহ আছে। এ প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় চরের মাধ্যমে। চরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নদীর স্রোত চারপাশে ছড়িয়ে যায়। যে কারণে ভাঙন একদিকে না হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পদ্মা নদীর বসতি এলাকার মাটির ৩০ থেকে ৩৫ ফুট গভীরে বালির স্তর রয়েছে। এভাবে স্রোত ছড়িয়ে পড়লে বালিগুলো স্রোতের সঙ্গে চলে যায় আর এলাকাটি ভেঙে যায়। যে লেভেলে গিয়ে বালি সরে যায়, ওই লেভেলে যদি জিও ব্যাগ বা আধুনিক কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে বালিটা আটকে রাখা যায়, বিশেষ করে গোয়ালন্দের পর যদি পদ্মার প্রবাহ একটা স্রোতেই রাখা যায়, তাহলে পদ্মা ব্রিজও নিরাপদ থাকবে, আবার ভাঙনও কমে যাবে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে পদ্মা আকার ও গতিপথ পরিবর্তন করেছে ধারাবাহিকভাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিবছর নদীতীর সংরক্ষণ, জিওব্যাগ, সিসি ব্লক, বাঁধ নির্মাণ ও জরুরি প্রতিরক্ষা কাজে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া ২০২৩ সালে বিশ্ব ব্যাংক ১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করে যমুনা রিভার সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প ১ বাস্তবায়নের জন্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২,৫০০ হেক্টর জমি সংরক্ষণ এবং নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা ও নদী ব্যবস্থাপনা–সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। এতে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকার মানুষ।

নদীভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ভোলা ও লক্ষ্মীপুর। বর্ষা মৌসুমে এসব জেলার বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনা নদী একাই দেশের মোট নদীভাঙনের প্রায় অর্ধেকের বেশি ঘটায়। বছরে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি শুধু যমুনা নদীতেই বিলীন হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা নদীতীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার। কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে মাত্র প্রায় ৮২০ কিলোমিটারে। ফলে প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে।

নদীভাঙন ঠেকাতে সরকার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে ২৮টি কর্মসূচির আওতায় ৪১ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ১২টি প্রকল্পের ৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকার কাজ শেষ হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় নদীতীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, পোল্ডার পুনর্বাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কাজে বিশ্ব ব্যাংক ও সহায়তা করছে।

সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশের ১৩টি জেলার ২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা এ বছর ভাঙতে পারে। সিইজিআইএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তীব্র ভাঙনের মুখে পড়তে পারে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, রাজশাহী, ফরিদপুর ও মাদারীপুর। তবে নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিইজিআইএসের পূর্বাভাসের তালিকায় না থাকলেও শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় গত দুই বছর তীব্র ভাঙন দেখা যায়। এই তিন জেলায় এবারও নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে। সিইজিআইএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে প্রায় ২০ লাখ ২০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।


  বিষয়:   বর্ষা  নদী ভাঙন  জলবায়ু পরিবর্ত.নদীভাঙন 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: