বিশ্বকাপের মাঠে বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া

আরাফাত রহমান

খেলা

বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। চার বছর পরপর এই আয়োজন শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং বিশ্ব

2026-06-13T11:59:01+00:00
2026-06-13T12:05:21+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
খেলা
বিশ্বকাপের মাঠে বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ ছায়া
আরাফাত রহমান
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম  আপডেট: ১৩.০৬.২০২৬ ১২:০৫ পিএম
ফাইল ছবি
বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। চার বছর পরপর এই আয়োজন শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়েরও এক বিশাল প্রদর্শনী। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের মাঠ কখনোই পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত ছিল না।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এর চেয়ে বড় আসর আগে দেখেনি বিশ্ব। তবে খেলার উত্তেজনার পাশাপাশি এবার আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয়তাবাদ, অভিবাসন রাজনীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক শক্তি প্রদর্শনের মতো বিষয়গুলো।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ ছিল প্রথম বড় উদাহরণ যেখানে সরকার ফুটবলকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনি বিশ্বকাপকে কাজে লাগিয়েছিলেন ফ্যাসিবাদী ইতালির শক্তি ও মর্যাদা তুলে ধরতে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ফুটবলকে রূপ দেওয়া হয়েছিল জাতীয় গৌরবের এক অনন্য প্রতীকে। ইতালির শিরোপা জয়কে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, বিশ্বকাপ ছিল মুসোলিনির জন্য এমন একটি মঞ্চ, যার মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার ইতালির ছবি দেখাতে চেয়েছিলেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই একমাত্র ঘটনা নয়। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা সরকারও বিশ্বকাপকে নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। সেই সময় হাজারো রাজনৈতিক বন্দি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যেও বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনা আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। আবার ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ ঘিরেও মানবাধিকার, শ্রমিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ইমেজ নির্মাণ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

অর্থাৎ বিশ্বকাপ শুধু খেলার প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক যোগাযোগমাধ্যমও। কোটি কোটি দর্শকের সামনে নিজেদের গল্প বলার সুযোগ পায় আয়োজক দেশ। অনেক সময় সেই গল্প হয় সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার, আবার কখনো তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বার্তা কিংবা জাতীয় শক্তির প্রদর্শন।

এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের বিশ্বকাপও ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ, অভিবাসন নীতি এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতীয়তাবাদী বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আধুনিক বিশ্বে খেলাধুলাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বদলে রাষ্ট্রগুলো এখন সফট পাওয়ার, কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং এবং জনমত গঠনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে।

বিশ্বকাপের শুরুতেই একটি ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান, যিনি আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি হিসেবে পরিচিত এবং বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য ফিফা থেকে মনোনীত ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। 

নিরাপত্তাজনিত ও ভিসাসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে তার যাত্রা আটকে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে উপস্থিত হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় তার।

ঘটনাটি শুধু একজন রেফারির ব্যক্তিগত হতাশার গল্প নয়; বরং এটি বিশ্বকাপের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় সীমান্তনীতির মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফুটবল যেখানে বৈশ্বিক ঐক্যের ভাষা হওয়ার দাবি করে, সেখানে ফিফা-নির্বাচিত একজন কর্মকর্তারও আয়োজক দেশে প্রবেশ নিয়ে জটিলতার মুখে পড়া দেখিয়ে দেয় যে খেলাধুলা এখনও ভূরাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রভাবমুক্ত নয়।

অবশ্য মুসোলিনির যুগ এবং বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কে এক কাতারে ফেলা যাবে না। মুসোলিনির ইতালিতে ক্ষমতার প্রদর্শন ছিল প্রকাশ্য ও সরাসরি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার সেই প্রকাশ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এখন তা দেখা যায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ভিসানীতি, কর্পোরেট প্রভাব, গণমাধ্যমের বয়ান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে।

মুসোলিনির যুগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকাশ ছিল দৃশ্যমান; বর্তমান বিশ্বে সেই জায়গা দখল করেছে কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা, গণমাধ্যমের প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিং। পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রভাব ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা একই রয়ে গেছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। ১৯৩০-এর দশকের ইউরোপীয় স্বৈরতন্ত্র এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে হুবহু পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা যাবে না। বরং মিল খুঁজতে হবে ক্ষমতার প্রদর্শন, জাতীয় পরিচয় নির্মাণ এবং জনমত প্রভাবিত করার কৌশলে।

বিশ্বকাপের ইতিহাস আমাদের শেখায়, ফুটবল কখনোই শুধু ফুটবল নয়।ট্রাম্প থেকে মুসোলিনি যুগে যুগে ক্ষমতার আধিপত্য ফুটবলের ওপর প্রভাব রাখছে । মাঠের ৯০ মিনিটের বাইরে এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভাষা, জাতীয় আবেগের প্রতীক এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক বার্তার বাহক। স্টেডিয়ামের গ্যালারি, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, সম্প্রচার প্রযুক্তি কিংবা আয়োজক দেশের নীতি—সবকিছুই বৃহত্তর একটি গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপও সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়। ওমর আরতানের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চের পেছনেও সীমান্ত, পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার রাজনীতি সক্রিয় থাকে। প্রশ্ন শুধু একটাই, বিশ্বকাপ কি শেষ পর্যন্ত মানুষকে একত্রিত করার উৎসব হয়ে থাকবে- নাকি জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের নতুন মঞ্চে পরিণত হবে?

উত্তর হয়তো মিলবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্তে নয়, বরং বহু বছর পরে, যখন ইতিহাস ফিরে তাকাবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের দিকে। তখন হয়তো আবারও প্রমাণিত হবে —ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি সময়, সমাজ এবং রাজনীতিরও এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।


Loading...
Loading...

খেলা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: