গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, যানজট নিরসন এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালু থেকে শুরু করে সাইকেল শেয়ারিং, বৈদ্যুতিক বাস এবং মনোরেল বিভিন্ন পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে।
এর মধ্যে পুরোনো বাস তুলে নিয়ে ইলেকট্রিক বাস চালু, নারীদের জন্য পিংক বাস, বাসরুট রেশনালাইজেশন আইন প্রণয়ন, একাধিক নতুন মেট্রোরেল ও মনোরেল নির্মাণ এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ অন্যতম।
এছাড়া দেশের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বড় বড় সেতু ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হবে। এ লক্ষ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
জানা গেছে, গত দুই দশকে যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার বর্তমান নাজুক অবস্থার সমাধানে একটি হালনাগাদ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করা হচ্ছে। সংশোধিত এই পরিকল্পনায় আগামী ২০ বছরে প্রায় ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বাস রুট শৃঙ্খলায়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এসটিপি সংশোধন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত ২০ বছরে কার্যকরী কোনো উদ্যোগ না থাকায় যানজট পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। যার সমাধানেই এই নতুন পরিকল্পনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ আলাদা আলাদাভাবে নয়, সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তবেই কাঙ্খিত পরিবর্তন আসবে। একাধিক পরিবহন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে রাজধানীর সড়কে দীর্ঘদিনের যানজট ও দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গণপরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাসগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া। এর বদলে পরিবেশবান্ধব আধুনিক ইলেকট্রিক বাস চালু করা এবং বাসগুলোর জন্য আলাদা চার্জিং স্টেশন ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
এছাড়াও রাজধানীতে মেট্রোরেল ও মনোরেল নেটওয়ার্কসহ আরও ৬টি নতুন মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পাতাল মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫) নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে সহজে যাতায়াতের জন্য মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সড়ক অবকাঠামো ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। সড়কে যানজট এড়াতে রিং রোড, রেডিয়াল রোড এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কে ডিজিটাল টোল কালেকশন এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
সড়কে নিরাপত্তা ও সেবার মানোন্নয়ন অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেশন এবং পেশাদার চালকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নারীদের যাতায়াত নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পিংক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পণাও রয়েছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পের জন্য মোট ১১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর জন্য ৭ হাজার ৩৫০ কোটি ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট)-এর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। ফলে চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) তুলনায় এমআরটি লাইন-১-এর বরাদ্দ প্রায় নয় গুণ বৃদ্ধি পাবে। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৮০১ কোটি টাকা। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫-এর বরাদ্দও ৮৬৩ কোটি থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া দরপ্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। যা সরকারের মূল প্রাক্কলনের প্রায় দ্বিগুণ। এদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর গতি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫), নর্দান রুটের প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মতিন চৌধুরী।
তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, এর আগে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় কাজের অগ্রগতি কিছুটা ধীর ছিল। তবে এখন নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুটের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকল্পের ১০টি প্যাকেজের মধ্যে একটি প্যাকেজ ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ; এরই মধ্যে ৮২-৮৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি নয়টি প্যাকেজের মধ্যে বেশ কয়েকটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলো বর্তমানে চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এখনো তিনটি প্যাকেজ (৭, ৮ ও ১০ নম্বর) চূড়ান্তভাবে বাকি আছে, যেগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখন ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়ন ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, কিছু উন্নয়ন অংশীদারের শর্তের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে পুনঃদরপত্র আহ্বান বা দর আলোচনার (নেগোশিয়েশন) সুযোগ না থাকায় সরকারকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। যা ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে জটিল করে তুলছে।
এছাড়াও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ও শর্তের কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হলেও তা অবশ্যই দেশের স্বার্থ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।