শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের ইতিহাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট ঘোষণা করেন। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে বরাদ্দ দীর্ঘলাফ দিয়ে বেড়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সরকার বলেছে, শিক্ষাখাতের এই বিনিয়োগকে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এবারও উন্নয়নের চেয়ে পরিচালন ব্যায় বেশি ধার্য করা হয়েছে।
শিক্ষার কোন খাতে কত বরাদ্দ: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই বছর বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি ৯২ টাকা। এই খাতে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার ২৯৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৪৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। এই বছর প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এ বিভাগের পরিচালন ব্যয় ৩২ হাজার ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৬৭৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে প্রস্তাব করা হয়েছে ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। এ খাতে পরিচালন ব্যয় ১১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ৬ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিগত অর্থ বছরের পরিসংখ্যান: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেড়েছিল ৯ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়েছিল ৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়েছিল ৬ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ কমেছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার বরাদ্দ প্রস্তাব করেছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এবার ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে বিএনপির সরকার প্রস্তাব করেছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে একলাফে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বেড়েছে।
শিক্ষায় পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে গুরুত্ব: বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে বেশ কিছু খাতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে সরকার।
জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে নতুন কারিকুলাম পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নৈতিক মূল্যবোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সরকার কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা নিজস্ব মেধা অনুযায়ী দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ বা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হবে। এছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষাকে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু করা হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য সহায়ক প্রযুক্তি ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদানের পরিকল্পনাও বাজেটে রয়েছে।
মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ রোধ করে সেটিকে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে বিদেশে অবস্থানরত উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করা হবে। উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনে কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ না রেখে স্কুল-কলেজে বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সরকার বলেছে, এই আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলবে।
তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছে, বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার এবং দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর সরকারের জোর দিতে হবে।