মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাপ্যতা দেশের প্রতিটি খাতে গভীর ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি হলো উৎপাদন ও সেবা খাতের মূল চালিকাশক্তি।
তাই এগুলোর দামবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতি, সমাজ ও জীবনযাত্রায় চেইন রিঅ্যাকশন বা ডমিনো এফেক্ট তৈরি করে। এতে সকল উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে এবং রপ্তানি বাণিজ্য বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সেচের খরচ বাড়ায় কৃষিপণ্যেরও উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে। উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা স্বভাবতই সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
সম্প্রতি সময়ে দীর্ঘ দেড় দশকের রেকর্ড ভেঙে দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম এক লাফে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে সরকার। দুই ধাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বিদ্যুতের এ বড় মূল্যবৃদ্ধি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেবল উদ্বেগজনকই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত। জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি করা হলো এমন এক সময়ে, যখন সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সংকুচিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে।
যদিও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সরকার ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির কয়েক দফা দাম বৃদ্ধি করা হয়। এপ্রিলে এলপিজি, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। এবার বিদ্যুতের দামও রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতে বিশাল ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে এবং আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ সহায়তার শর্ত পূরণ করতে মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ খাতের এ কাঠামোগত লোকসান ও ভর্তুকির দায় কেন বারবার কেবল সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়েই চাপানো হবে?
বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা, সিস্টেম লস এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ তথা কেন্দ্রভাড়া বাবদ বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে অলস বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করার দায় সাধারণ মানুষের নয়।
এ ব্যাপারে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেগুলো বন্ধের দাবি করা হলেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো। এর প্রভাব সবখানেই পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে পারিবারিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি এখনো ঝুঁঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি।
চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবা খাতের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ একই সময়ে আয় ও মজুরি বৃদ্ধির গতি তুলনামূলক কম থাকায় সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময়ে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
জ্বালানির এ দাম সমন্বয়ের প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। রান্নার জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সিপিডির তথ্যমতে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত মার্চ মাসে ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে জুনে এক হাজার ৮৮৫ টাকায় পৌঁছেছে।
অর্থাৎ, এ সময়ে এলপিজির দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সংস্থাটি মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হলে দেশের অর্থনীতি কতটা ঝুঁঁকির মুখে পড়তে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেও মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি।
বেসরকারি সংস্থাটির মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি এবং বাজারে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের কারণে খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে এসে দেশের আর্থিক, সামাজিক ও উৎপাদনশীল খাত নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এসব সমস্যা নতুন নয়; বরং কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
তবে বিদ্যমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় শুধু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।