উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন উৎসবের আমেজে কিছুটা হলেও ছায়া ফেলেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব এবার কোরবানির ঈদের বাজারে স্পষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে পরিমাণ কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় কম কোরবানির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কোরবানিযোগ্য পশুর প্রায় ২০ শতাংশ থেকে গেছে উদ্বৃত্ত। যার আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। সে হিসেবে কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ পশু। যার বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা। কম পশু কোরবানি হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন চাষী, খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিস, খামারি, জেলা প্রতিনিধি, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খামারি ও কৃষি অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সরকার কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় এবার প্রায় ৩০ লাখের বেশি কম পশু কোরবানি হয়েছে।
ঈদের আগে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে জানিয়েছিল। ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাসনা আখতার জানান, সদ্য শেষ হওয়া কোরবানির ঈদে ঢাকায় প্রায় ৯ লাখ ৬২ হাজার পশু কোরবানি করা হয়েছে। যা গত বছর ছিল ৯ লাখ ৮০ হাজার। গত বছরের তুলনায় কমেছে ১৮ হাজারের বেশি পশু কোরবানি। ময়মনসিংহ বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার। বিপরীতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কোরবানির চাহিদা নিরূপণ করে ৪ লাখ ৪০ হাজার। তবে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পশুপালন দপ্তরের পরিচালক ডা. মনোরঞ্জন ধর জানান এ আনুমানিক কোরবানি হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজারটি পশু। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত তথ্য নয় উল্রেখ করেন এই কর্মকর্তা।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম জানিয়েছেন, এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। তাদের প্রাথমিক হিসাবে কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজারটি পশু। খুলনা বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৫টি পশু। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪২ হাজার পশু বেশি কোরবানি হলেও প্রাণিসম্পদ অফিস যে চাহিদা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় ২ লাখ ৩৩ হাজার কম। খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. মো. গোলাম হায়দার বলেন, গতবারের তুলনায় খুলনা বিভাগে কোরবানি বেড়েছে। প্রাথমিকভাবে কোরবানি হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৪৬ হাজার পশু। এবার ১৪ লাখ ৪৬ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু ছিল। রংপুর জেলায় এবার কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৬টি। কোরবানি হয়েছে ২ লাখ ৬ হাজারের মতো পশু।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগর ও জেলা মিলিয়ে এবার কোরবানি পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৮ লাখ ১৬ হাজার। জেলাটিতে কী পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলায় এ পর্যন্ত ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এবার যে পরিমাণ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার তুলনায় কোরবানি কমই হয়েছে।
বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে, চলতি বছর জেলায় ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। কোরবানির চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি, যা গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮০ কম। বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এবার কী পরিমাণ পশু কোরবানি হয়েছে সেটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রস্তুত হয়নি। পশু কোরবানি প্রসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, মাঠপর্যায় থেকে এখনো তথ্য সংগ্রহ চলছে। দুএকদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তালিকা হয়ে যাবে। চুড়ান্ত তালিকা আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করা হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে পশুখাদ্যসহ উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কোরবানির পশুর দামও বেড়েছে। অন্যদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক মানুষ কোরবানি করতে পারেননি। আবার অনেকেই একা ও বড় পশু কোরবানির চেয়ে শরিক বা ভাগে কোরবানি করেছেন।