বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়িয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার।
এর অংশ হিসেবে ভঙ্গুর অর্থনীতির অবস্থা থেকে শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রচলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারা থেকে সরে এসে নতুন একটি পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো গ্রহণ করেছে।
সব মিলিয়ে সরকার যে নতুন উন্নয়ন কৌশল নিতে যাচ্ছে, তা শুধু একটি পরিকল্পনা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন পথে নেওয়ার একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সরকার জুন মাসের মধ্যেই পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন কৌশলগত কাঠামো চূড়ান্ত করতে চায়। এই কাঠামোই আগামী কয়েক বছরের সংস্কার, বাজেট, উন্নয়ন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
জানা গেছে, অর্থনীতির উন্নয়ন রূপরেখায় দুইটি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। যা বর্তমান অর্থনীতির প্রায় দ্বিগুণ আকারের সমান। এরই মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে
২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বার্ষিক প্রায় ৯ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।
সরকারের নতুন এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে- আগামী এক দশকে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা।
এ যাত্রার প্রথম ধাপ হিসাবে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এমন একসময় ধরা হচ্ছে। যখন চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে খোদ সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনছে।
অন্যদিকে সরকার প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়ে অর্থনীতির চাকা সচল করতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অতীতের উন্নয়ন কাঠামোগুলো অনেক সময় কার্যকর বাস্তবায়নের বদলে কাগুজে নথিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল পরিকল্পনার কারণে অনেক অকার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। যা অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে; তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা আবশ্যক। আর সেই কারণেই আসন্ন বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় এই সাহসিকতা বা উচ্চাভিলাষ দেখানো হচ্ছে।
সরকার মূলত কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ধরাটা স্বাভাবিক। এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধির গুণগত মান ও অর্থায়ন। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গেলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। তবে এটা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহের কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা নেই।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করতে হবে।
গত দেড় বছর ধরে উচ্চ সুদের হার অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের সমালোচনার মুখে রয়েছে। অনেকে মনে করেন, শুধু মুদ্রানীতি নয়, বরং খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের মূল কারণ বণ্টন ব্যবস্থার বাধা। এটি সরকারের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য থাকা ভালো এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখাও যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো ঠিক হবে না। বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কম।
এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির অন্তুত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যা এখন মাত্র ২৭-২৮ শতাংশে আটকে আছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না করে কেবল লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্বস্তি আনা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু সংখ্যার ফাঁদ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত আমূল সংস্কার। সরকারিভাবে এ পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১’।
এতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে এই কৌশল চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী।
তথ্যমতে, নতুন কাঠামোয় রাষ্ট্রনির্ভর ওপর থেকে নিচ প্রবৃদ্ধি কৌশল থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতনির্ভর, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য এবং তুলনামূলক বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে বিনিয়োগ ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একই সময়ে রাজস্ব আদায় ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কাঠামো অনুযায়ী উন্নয়ন ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগও মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই কাঠামোতে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কৌশল কাঠামোর উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই নির্দেশিকার মূল উদ্দেশ্য হলো পরিকল্পনাগুলো কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে, কারণ এসব ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উল্লেখ করেন, তাই নতুন অর্থনৈতিক রূপকল্পের লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে নীতির বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত; যেগুলো যেন সরাসরি দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে।