ছাতা মাথায় দিয়ে কুসুম দাঁড়িয়ে আছে তার মেয়েদের স্কুলের সামনে। ভিজে যাচ্ছে তার অপূর্ব সুন্দর পা দুখানি। জলের ঝাপটায় শাড়ির আঁচল গান শোনাচ্ছে। হলুদ রঙের শাড়ি, আর লাল ব্লাউজ, কপাল টিপ শুন্য। চোখে হয়তো কাজল ছিল, সেটি এতটাই সূক্ষ্ম কাছ থেকেও বোঝার উপায় নেই। ঠোঁটটা ঠিক মতো রাঙানো হয়নি। হয়তো একটু গোলাপী রঙের লিপজেল দেয়া হয়েছে। এমনিতেই কুসুম কুসুমের মতোই সুন্দর। তার দীর্ঘ এলোমেলো চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, মনে হচ্ছে কেউ যেন বলছে, পাখি হয়ে আকাশ ছুঁয়ে দেখ। বৃষ্টিস্নাত এই দিনে, সামনের দিকে ছেড়ে রাখা দু-একটা চুল বাতাসে উড়ছে।
-আপনি কুসুম ।
-হ্যাঁ
-কবিতা লেখেন বুঝি
-একটু
-আপনাকে আমি জানি ।
-ভালো তো। কি করে জানেন আমাকে।
-ডা. ফারুক আমাকে বলেছে।
ডক্টর ফারুকের কথা বলার সাথে সাথে কুসুমের খুব বিরক্ত লাগতে থাকে।
-আসলে আমি এবং ডক্টর ফারুক ক্লাসমেট। ছোটবেলা একই স্কুলে পড়তাম। এরপর ফারুক মেডিকেলে ভর্তি হয় আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হই। এখনো ফেসবুকে যোগাযোগ আছে। এছাড়া আমি ছোট্ট শহর লালপুরে একটা বাড়ি করেছি। তার পাশেই ফারুকের একটা বাড়ি আছে।
-এত কথা আমাকে বলছেন কেন? আপনার সঙ্গে আমার একটু আগে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে এতো কথা নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না।
-দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনি বিরক্ত হচ্ছিলেন দেখে আমি ব্যাখ্যা করছিলাম।
-আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না। আমার মেয়েদের ছুটি হয়েছে, আমি যাচ্ছি।
প্রফেসর হাসান খুব কষ্ট পেল। সে একটি সরকারি কলেজের প্রফেসর। তাকে এভাবে অপমান করল মেয়েটি।
কুসুম মনে মনে একটু লজ্জিত হলো। ‘আহা এতক্ষণ কথা বলেছে লোকটির নামই জানা হলো না। থাক বাদ দেই। সেঁধে কথা বলতে আসলে এমনই অপমান করা উচিত’।
প্রফেসর ড. হাসান। পিএইচডি করেছেন একটা ইউনিভার্সিটি থেকে। এখন কলেজের প্রফেসর। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লেকচার দেন। তার বিষয়বস্তু বাংলা। তিনি প্রায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা, ভদ্র, শান্ত একটি মানুষ।
বিয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায় তার স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। সেই ছেলে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। ১২ বছরে সে ছেলে ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা করেনি। তার বোন তাকে সহযোগিতা করেছে। কোনো মেয়েদের দিকে সে ভালো করে তাকিয়ে দেখে না কারণ তার একটাই মনের ইচ্ছা তার সন্তানকে বড় করা।
আজ কেন যে এই মহিলার সঙ্গে সে কথা বলতে গেল। সে মনে মনে একটা ভাব ছিল। ‘বিরক্তিকর একজন নারী। বাইরের আবরণটাই কেবল সুন্দর, সে কবি অথচ ভিতরটা ভালো নয়। তবে কোনো একটা রহস্য আছে ডক্টর ফারুকের কথা বলাতে খুবই রাগ করল মনে হয়।’
সে মনে মনে আরো ভাবল, ‘ফারুকের যে চরিত্র, যেখানে যাবে সেখানেই নারী ঘটিত একটা সমস্যা তৈরি করবে, তবে সে বন্ধু হিসেবে ভালো’
কুসুম দেশের একজন বিখ্যাত লেখক। তার দুটো মেয়ে। একজন ক্লাস ফোরে পড়ে এবং একজন ক্লাস টু তে পড়ে। বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় তার হাজবেন্ড মারা যায়। যখন তার হাজবেন্ড একটি সড়ক দুর্ঘটনার মারা যায়, তখন তার ছোট সন্তান তার গর্ভে, কেবল প্রস্ফুটন হচ্ছে। গাজীপুরে সে বড় একটাফার্মের চাকরি করতো সেখান থেকে ফেরার পথে তার দুর্ঘটনা ঘটে। কুসুমের আর বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে নেই। এখন সে দুই সন্তানকে নিয়ে একা থাকছে শুধুমাত্র তার মা তার সঙ্গী হয়েছে। সে একটি সরকারি কলেজের রসায়নের প্রফেসর।
কুসুম এবং হাসানের দুজনারই পোস্টিং ঢাকায়। তারা দুজন বাচ্চাদের নিতে এই স্কুলে প্রতিদিন আসে। অদ্ভুত একটা বিষয় এখন পর্যন্ত তাদের দেখা না হলেও যেদিন তাদের ঝগড়া হলো এরপর প্রতিদিন তাদের দেখা হতে লাগলো।
কুসুমের একদিন মনে হল এই লোকটা ভালো এর সঙ্গে এমন আচরণ করাটা ঠিক হয়নি।
-সরি, সেদিন মনে হয় খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি।
-না ঠিক আছে, ভালো থাকবেন ।
আজকে হাসানের কথা বলার কোনো ইচ্ছেই নেই। সে তার জীবনটা একা পার করতে চায়।
কুসুমের তিনটা বড় ভাই বোন আছে, কিন্তু তারা কখনোই তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেনি। সে খুব কষ্ট করে একটা গাড়ি কিনেছে, বাচ্চাদের ভালো স্কুলে পড়াচ্ছে, মায়ের যত্ন নিচ্ছে, কলেজে চাকরিটাও ভালোভাবে করছে। আজ খুব বৃষ্টি কিন্তু তার ড্রাইভার আসেনি। সে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়ালো, বাচ্চা দুটো একদম ভিজে গেছে।
কাছে পিঠে কোথাও কোনো রিকশা নেই। সে ভেবে পাচ্ছিল না কি করবে! হঠাৎ একটা গাড়ি তার সামনে এসে থামলো,
‘কোন দিকে যাবেন’-এইতো সামনে লালমাটিয়া।
-আমি ওদিকে যাচ্ছি আসুন আপনাকে নামিয়ে দেই, বাচ্চারা ভিজে যাচ্ছে।

কথার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল। কুসুম গাড়িতে উঠল। গাড়িতে উঠার একটু পরেই সে হঠাৎ খেয়াল করল যেখানটাতে তারা দাঁড়িয়েছিল সেখানটার একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে। সে মনে মনে ভাবছিল ‘আল্লাহ এই লোকটাকে পাঠিয়েছে অন্যথায় এ গাছের ডাল তার সন্তানদের গায়ে পড়তে পারতো।’
তাকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে হাসান তার ছেলেকে নিয়ে চলে গেল তার বাসায়। বোন এবং বোনের হাসবেন্ড এবং হাসান সবাই মিলে একসাথে থাকে। বোনের কোনো সন্তান নেই সে তার সন্তান দুটোকে মায়ের স্নেহ মমতা দিয়ে বড় করছে। বাসা পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেভেনে পড়া তার ছেলে বাবুন ছাপিয়ে পড়ে তার ফুফুর উপর, ‘দাও এক্ষুনি খেতে দাও খিদে পেয়েছে।’ ফুফু তাকে হাত দিয়ে খাইয়ে দেয়। হাসানের একটা ক্লাস আছে সে তাড়াতাড়ি গাড়ি ড্রাইভ করে চলে যায়।
আজিমপুর কবরস্থান থেকে বের হয়েই হাসান দেখতে পায়, মাথায় সাদা কাপড় জড়ানো কুসুম একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ফোলা। হয়তো কেঁদেছে কিছুক্ষণ আগে।
-আরে আপনি এখানে।
-আমার স্বামী এখানে শুয়ে আছে। আপনি এখানে!
-আমার স্ত্রী ও এ মাটিতে শুয়ে আছে। বারো বছর আগে মারা গেছেন উনি। বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে। আপনার?
-সাত বছর আগে, যখন ছোট বাচ্চা পেটে ছিল।
-কি অদ্ভুত আমাদের জীবন।
দুজন মিলে হাঁটতে হাঁটতে গেটের কাছে চলে এলো।
-আপনার সঙ্গে কেউ আসেনি কুসুম।
-আমার ভাই বোন আছে তারা তাদের মত থাকে। আমি এসেছিলাম এক আত্মীয় কে নিয়ে, তার কাজ পড়ে গেছে সে চলে গেছে।
-আমি তো আজকে গাড়ি নিয়ে আসিনি। আপনি চলেন আমার সাথে, রিকশায় কোনো অসুবিধা হবে নাতো।
-না কি আর, চলেন।
ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে,
- আপনার কি মন খারাপ? এত বছর তার জন্য কেঁদে চলছেন। খুব ভালবাসতেন বুঝি।
- খুব। আপনার মন খারাপ হয় না?
- খুব হয়। কেবল জীবনটা শুরু করেছিলাম এর মধ্যেই সব শেষ।
- বৃষ্টি আসবে মনে হয়।
রিকশার হুকটা তুলে দেয়া হয়। দুজনেই একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়। রিকশায় চলতে চলতে। তারা দুজন দুজনার সঙ্গে পরিচিত হয়। এখন আর রাগ নেই দুজনের প্রতি দুজনার। মোবাইল ফোনের নম্বর বিনিময় হয়।
পরের শুক্রবারেও তাদের দেখা হয় আজিমপুর কবরস্থানে। এবার অবশ্য দুজনার সঙ্গেই আত্মীয় ছিল। দূর থেকে চোখের কথা বিনিময় হলো কাছে এসে কথা বলা হয়নি।
পরের দিন যখন স্কুলে দেখা হল,
-কাল কথা বললেন না কেন?
-সঙ্গে মনে হয় আপনার মা ছিলেন।
-ঠিক বলেছেন আর আপনার সঙ্গে মনে হয় আপনার বোন ছিল
-একদম ঠিক। বুঝলেন কি করে?
-একই রকম দেখতে তাই।
এভাবেই একটা মাস কেটে যায়। দুজন দুজনাকে বোঝার চেষ্টা করে। কুসুম খুব শান্ত ভদ্র একটা মানুষ। হাসান ও ঠিক তাই। একটা বয়সের পরও আবেগ থাকে কিন্তু তার থেকেও বড় জিনিসটা থাকে দুজন দুজনাকে বোঝার ক্ষমতা। এখন তারা প্লান করে কবরস্থানে যায়। পূর্বের প্লান অনুযায়ী স্কুল থেকে একসাথে বাসায় ফিরে আসে। ছেলেমেয়েরা একই স্কুলে পড়ে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সীমা নাই। ইরা বৃহস্পতিবার রাতে তার মাকে আস্তে আস্তে করে বলে,
-মা বাবুন ভাইয়েদের বাসায় কালকে যাবে?
-না, কেন ওদের বাসায় আমরা কেন যাবো?
ছোট মেয়ে ইরাবতীর কথায় চমকে উঠে কুসুম,
-আজকে ওনার সঙ্গে স্কুলে ক্যান্টিনে দেখা হয়েছিল উনি আমাকে আর আপুকে দুটো দুটো চারটা কিটক্যাট চকলেট কিনে দিয়েছে। মাথায় হাত দিয়ে আদর করে দিয়েছে।
চমকে উঠে, সে তার বড় মেয়ে অনুকে ডেকে নিয়ে আসলো।
-কিরে মা, আজকে বাবুন তোদেরকে চকলেট দিয়েছে।
-হ্যাঁ মা বাবুন ভাইয়া অনেক ভালো। আমরা তিনজন মিলে অনেকক্ষণ মাঠে খেললাম, ইস ও যদি আমাদের ভাই হতো। সে তো আমাকে বলেছে শুক্রবার তোমরা দুজন আমাদের বাসায় আসবা। ওমা কেউ যেতে বললে যেতে হয় তো।
মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।
কুসুম ফোনটা ধরতে ওপাশ থেকে হাসান বললো ‘আসেন না. কালকে আমাদের বাসায়। বাবুন খুব কান্নাকাটি করছে।’
-না, মানে আমি যেতে পারব না। তবে আমার ড্রাইভার ওদের দুজনাকে আপনাদের বাসায় পৌঁছে দেবে।
-ঠিক আছে, তাই হবে।
পরদিন ইরা, বাবুন আর অনু তিনজনে মিলে ঘর মাথায় তুলে ফুটবল খেলতে লাগলো। বাপুনের ফুফুর খুব ভালো লাগলো। তিনি যখন শুনলেন বাচ্চা মেয়ে দুটোর বাবা নেই, তখন তার মনে অন্য একটা ইচ্ছা সাথে সাথে জেগে উঠলো। যদিও এদের সঙ্গে ভালো করে পরিচয় না হওয়ার আগে কিছুই বলা যায় না।
এভাবে এক মাস প্রতি শুক্রবারে সকালবেলা দুই বোন বাবুনদের বাসায় যায় আর খেলাধুলা করে আবার বিকাল হলে ফিরে আসে। বাবুনের ফুপুর মনে হল সে তিনটা বাচ্চার মা হয়ে গেছে। তার মনে যেন খুব অহংকার হল। তিনটা বাচ্চা সে তো অহংকারের মাটিতেই পা ফেলার মত না।
কুসুম খুব ঝামেলায় পড়েছে। তার মা তার ভাইয়ের কাছে চলে যেতে চাচ্ছে। কারণ তার শরীরটা ভালো নেই, ভাই একজন ডাক্তার।
সে বারবার কুসুমকে বলছে, ‘মাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও, মায়ের সার্বক্ষণিক যত্নের প্রয়োজন।’
কুসুম ভেবে পাচ্ছে না এখন এতো ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য কাকে নিয়ে আসবে।
অনেকদিন পর তার হাসানের সঙ্গে একদিন দেখা হয়। কুসুম মন খারাপ করে স্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল,
‘কি হয়েছে আপনার?’
-আর বলবেন না, মা বাড়ি চলে যাবে, বাচ্চাদের আমি কার কাছে রাখবো।
-আরে এইটা কোনো বিষয় হল আপনি আমাদের বাসায় রেখে যেতে পারেন। আমার বোন ভীষণ ভালো। সে দেখাশোনা করবে। যখন কলেজ থেকে ফিরবেন তখন আবার নিয়ে আসবেন। আপনার আমার বাসায় যেতে হবে না, আপনি নিচে গিয়ে ফোন দিবেন। ওদেরকে আমার বোন নিচে পাঠিয়ে দেবে।
-ভেবে বলছেন তো
-আরে গত এক মাস ধরে আপনার বাচ্চারা তো সবসময় যাচ্ছে আমার বাসায়, কোনো অসুবিধা কি হচ্ছে!
-না আমি ভাবছি, আপনার বাসায় প্রতিদিন যাবে এতে আপনি যদি বিরক্ত হন।
-আমাদের উপরে কোনো কিছু নির্ভর করে না। বাচ্চারা কোথায় আরাম পাবে সেটা হচ্ছে বড় বিষয়।
-আজকে স্কুল ছুটির পর তিন বাচ্চাকে নিয়ে আমরা একটা রেস্টুরেন্টে যাব, আলাপ করব। দেখেন ওরা কি বলে। এবার ঠিক।
-ঠিক আছে।
ছুটির পর তিন বাচ্চাকে নিয়ে বসা হলো একটা রেস্টুরেন্টে। সেখানে আবার পাশে একটু খেলার জায়গা। বাবুন খুব একা থাকে তার কোন খেলার সাথী নেই। সে এই দুই বোনকে খুব পছন্দ করে। রেস্টুরেন্টের খেলার জায়গাটাতে তিনজন মিলে হই হুল্লোর করে খেলতে লাগলো। বারবার ডাকার পরও তারা আসলো না।
কুসুমের এত হাসি পেল,
সে জোরে জোরে হাসতে লাগলো।
-খুব হাসছেন যে!
-হাসবো না মিটিং এর তিন সদস্যের, এ বিষয়ে কোনো মনোযোগ নেই।
-তারা কি আনন্দ নিয়ে খেলছে দেখুন!
-আপনি আর দ্বিমত করবেন না।
-না করলাম না।
এরপর প্রতিদিন কুসুম বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে হাসানের বাসায় দিয়ে আসে। আবার কলেজ থেকে ফেরার পথে সে বাচ্চাদের ফোন দিলে, তাদেরকে হাসানের বাসার কাজের সহযোগী ছেলেটা, নিচে নিয়ে আসে।
বাচ্চারা এমন করতে করতে এক মাস পার করে ফেলে। তারা বেশ ভালো আছে। একদিন হাসানের বোন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের যাওয়া দেখছিল কুসুম সাধারণত গাড়ি থেকে নামে না, আজ সে গাড়ি থেকে নামলো।
হাসানের বোন উপর থেকে কুসুমকে দেখে খুব খুশি হয়।
‘কি মিষ্টি চেহারা ! কেমন ভদ্র নম্র। সুন্দর করে শাড়ি পড়েছে। তার মন ভরে যায়। তার ভাই হাসান যদি মেয়েটাকে বিয়ে করত খুব সুখে থাকতে পারতো। কিন্তু তার ভাই তো এই ১২ বছরে বিয়ের কথা শুনতেই চাইলো না’
সে মনে মনে আরো ভাবলো, ‘কি করা যায়, কীভাবে এদের বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায়।’
স্কুলের পাশে একটা পার্কে সেদিন বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে কাশফুল ফুটেছে। কুসুম সেখানের বেঞ্চিতে বসে দুটো কবিতা লিখল।
দূর থেকে হাসান খেয়াল করছে, ‘কুসুম কি করছে?’
-কি কবি কি করছেন?
-কবিতা লিখছি
-কবিতা লেখা শেষ হলে আমাকে দিয়ে দিয়েন!
-আপনি কি করবেন?
-পড়বো।
-এই নেন কবিতা,
আলিঙ্গন
‘তুমি ‘কখন আসবে’
ফোনের অপর পাশ থেকে হেসে আমার উত্তরটা ছিল,
‘আসছি, কি হয়েছে বলো তো’
আহ্লাদে গলায় তুমি বলেছিলে,
‘জানিনা, কতক্ষণ লাগবে’
তোমার আগ্রহ দেখে আমার মনে হয়েছিল,
‘পথটা কেন শেষ হয় না।’
পৌঁছে গেলাম তোমার গন্তব্যে,
তোমার চোখে চোখ পড়তেই ‘টেনে নিয়েছিলে বুকে ঠিক মাঝখানটাতে’
তোমার মনের হাওয়া আর আমার মনের ঝড় মিশে কেমন একটা ভালো লাগা,
কি আগলা একটা আলিঙ্গন।
নিঃশব্দ সেই আলিঙ্গনে
আমি শীতল হয়েছিলাম,
উত্তপ্ত মরুর মরীচিকাময় প্রান্তে।
কুসুম আর হাসানের সম্পর্কটা যেন কেমন কাছে এসেও, আসা হয় না তার কাছে। হঠাৎ করে একটা লোক দৌঁড়ে এসে কুসুমের হাতে ছুরি দিয়ে একটা পোজ দিয়ে তার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে দৌড়ে চলে যায়। বিষয়টা এত দ্রুত ঘটে কুসুম এবং একটু দূরে থাকা হাসান কিছুই বুঝতে পারে না। কুসুমের চিৎকারে হাসান দৌড়ে তার কাছে আসে, তার হাত থেকে অনবরত রক্ত ঝড়ছে। হাতের পাঁচটা আঙুলই কেটে গেছে। কুসুমকে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে যায় হাসান। গাড়িতে হাসান তার সাদা রুমাল দিয়ে কুসুমের হাতটাকে চেপে রাখে। ডান হাতের পাঁচটা আঙুলে ব্যান্ডেজ করা হয়। ব্যথার ও জ্বরের ওষুধ দেওয়া হয়। হাসান দ্রুত তার বড় বোনকে ফোন করে কুসুমের বাসায় চলে আসতে বলে। হাসানের বড় বোন আসমা, কুসুমের কাছে বসে থাকে। ঘুমের ওষুধের কারণে কুসুম ঘুমিয়ে থাকে। কুসুমের বাসায় রান্নার মেয়েটি তার জন্য সুপ রান্না করে দেয়। আসমা ঘুরে ঘুরে কুসুমের বাসার প্রতিটা জিনিস দেখতে থাকে। মনে মনে ভাবে, কি সুন্দর গোছানো পরিপাটি বাসা। দেয়ালে দেয়ালে বাঁধানো কবিতা তার খুব ভালো লাগে। গুটি শুটি মেরে কুসুম ঘুমিয়ে আছে। আসমা তার প্রতি স্নেহ ও মমতা অনুভব করে।
বাচ্চাদের নিয়ে হাসান বাসায় আসে। দুই মেয়ে মায়ের অবস্থা দেখে কান্নাকাটি করে। তারা মা মা করে ডাকছিল। হাসানের ছেলেটিও তাদের সাথে কুসুমকে মা ডাকতে শুরু করল।
তিনজন একসাথে হাসানকে জিজ্ঞেস করল, ‘মায়ের কি হয়েছে?’
হাসান একটু অবাক হয়ে বাবুনের দিকে তাকিয়ে বলল,‘মা না আন্টি বলো’
-না, আমি মা বলবো । ওরা কেন মা বলে
আসমা হাসানকে বললো,‘তুই রাতে থেকে যা কখন কি লাগে।’
-না, তুমি থাকো।
-নারে মেয়েটার জ্বর আসছে, হাতে ব্যথা আছে প্রচন্ড। কখন কোন ওষুধটা খেতে হয় । তুই থেকে যা। আমি বরং বাচ্চাদের নিয়ে বাসায় চলে যাই।
হাসান খুব অস্বস্তি নিয়ে থেকে গেল। কুসুম এসবের কিছুই জানে না সে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। যে মেয়েটি রান্না করে কুসুমের বাড়িতে সে রাত আটটার দিকে চলে গেল। হাসান ও কুসুম দুইজন শুধু এই চার রুমের বাসাটিতে রয়ে গেল।
রাত বারোটার দিকে কুসুম চোখ মেলে তাকিয়ে বলল, ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে খেতে দেন। আপনি এ বাসায় কেন, রাত হয়েছে না? আমার বাচ্চারা কোথায়’
-আপনি হাতে ব্যথা পেয়েছেন। বাচ্চাদের নিয়ে আমার বড় বোন চলে গেছে।
-ও
-আমি কি আপনার রান্নাঘরে গিয়ে কিছু তৈরি করে নিয়ে আসবো।
-ফ্রিজে সুপ বানানো আছে একটু গরম করে দিতে পারেন।
হাসান একা একা, সুপ গরম করে নিয়ে আসে।
কুসুমের গায়ে অনেক জ্বর এই প্রথমবার হাসান কুসুমের কপালে হাত রাখে। দীর্ঘ সময় পড়ে সে কোনো নারীকে স্পর্শ করল। তার মনের মধ্যে ভয় আর সংকোচ কাজ করছে। সে বুঝে গেছে, কুসুম এবং তার পরিণতি কি হবে। একটু একটু করে, কুসুমকে খাইয়ে দিচ্ছিল হাসান।
-আপনার কি বেশি খারাপ লাগছে?
-হ্যাঁ।
-রাত প্রায় বারোটা বাজে, আমি কি অন্য রুমে গিয়ে ঘুমাবো না আপনার পাশে বসে থাকবো।
-আমার পাশে বসে থাকবেন।
-আপনি যা বলবেন। কিন্তু পাশে বসে থাকলে তো আবার কপাল ধরতে ইচ্ছা করবে।
-সে তো আর অকারণে ধরেননি, জ্বর হয়েছে তাই কপালে হাত দিয়েছেন।
-এই
-কি ?
-এই, এই, এই
-কি কি, ভালো লাগছে না। জ্বর আসছে, মাথা ব্যথা করছে, হাতে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে।
-কপালে একটা চুমু দেব।
-আপনার ভালো লাগলে দেন
-তোমার বুঝি ভালো লাগবে না।
-জানিনা এখন এইসব আলাপ করার সময়।
-জানো যে শয়তানটা তোমার মোবাইল কেড়ে নিয়েছে, তার উপর আমার অনেক রাগ হচ্ছে। কিন্তু সে এভাবে কেড়ে না নিলে আজ তোমাকে কাছে পেতাম না।
-রাত বাড়ছে আর কী সব পাগলামির কথা বলছেন।
-আমি তোমার কোন পাশে শুয়ে থাকব।
-যেখানে ইচ্ছা ।
-এ আবার কেমন কথা, বাম পাশে শুয়ে থাকি।
-থাকেন।
-মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ?
-দেন ।
-পা টিপে দেবো ?
-না, লাগবে না ।
-আমার ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমাবো ।
-আচ্ছা ঠিক আছে আপনি ঘুমিয়ে পড়েন, আমি বসে আছি।
ভোর রাতের দিকে হাসান-কুসুমের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে।
বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। জানলা খোলা থাকায় বৃষ্টি এসে বিছানা ভিজিয়ে দিল। বৃষ্টির জল গায়ে লাগতেই কুসুমের ঘুম ভেঙে গেল। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, হাসানের দিকে। কৃষ্ণের মত কালো নিষ্পাপ একটা চেহারা। মুখের দিকে তাকিয়ে লিখে ফেলা যায় হাজার খানেক কবিতা। হঠাৎ করেই তার ভালো লাগতে শুরু করে। হাসান ও জেগে যায়। দুজন দুজনের চোখে পড়তেই লজ্জা পায় তারা। হাসানের ও ভালো লাগতে শুরু করে হঠাৎ করেই।
-আমাকে বিয়ে করবেন?
-করব ।
-আগামী শুক্রবার ।
-ঠিক আছে।
- আপনার কোন মতামত নেই?
- আপনি যা বলবেন।
মনে মনে ছেলেটি খুব খুশি হয়। সে বুঝতে পারে কবিকে বিয়ে করলে ভালো থাকা যাবে।
পরদিন সকালবেলা বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এ বাসায় চলে আসে হাসানের বড় বোন। সে এসে কল বেল বাজাচ্ছে ভিতর থেকে কেউ দরজা খুলছে না। রান্না করা খাবার দিতে সে এসেছে, কিন্তু দরজা বন্ধ। সে মনে মনে খুশি হয়। অবশেষ দরজা খুললো।
- বাচ্চারা কোথায়
-স্কুলে, দরজায় দাঁড় করিয়ে কথা বলবি, ভিতরে যাবো না?
-আসো ।
-তোরা বিয়ে করে ফেল, দুজনারই অনেক ঝামেলা হচ্ছে।
-কি সব বল !
-মেয়েটা ভালো আর ওর বাচ্চারা আমাকে অনেক পছন্দ করে। আমি ওদের মানুষ করে দেব।
তুই শুধু বিয়ে কর।
-তুমি যা ভালো বোঝো, তাই কর ।
-তার মানে, তুই রাজি। এক যুগ পর। ওরে আল্লাহ মুখ তুলেছে চাইছে। তোর দুলাভাইরে এখনি ফোন করে জানাই। সে তো আবার অফিসে তাকে এখনই আসতে বলি।
-কি সব বলছো দুলাভাই অফিস থেকে আসবে কেন এখন!
-আরে একটা বিয়ের আয়োজনে অনেক ঝামেলা।
-ওরে বুবু থাম, আজকে মাত্র সোমবার শুক্রবার বিয়ে করব দেরি আছে।
-ওমা তুই দিন ঠিক করে ফেলছিস।
-না মানে বলছিলাম শুক্রবার সাধারণত তো বিয়ে হয় তাই।
-এক রাতের মধ্যে এত কিছু। তোর খাবার দিতে এসেছিলাম। তোরা দুজন আজকেও একসাথে থাক। গল্প কর। আমি যাই। আমার এখন ঘর গুছাতে হবে। অনেক কাজ। ছোট ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা।
-কিচ্ছু করবি না।
-তুই কিন্তু খুব কিপটা। এখানে আবার কিপটামি করিস না। তোর থেকে কুসুম অনেক ভালো।
-তুমি যাকে চেনো না, তার এত প্রশংসা কেন কর?
-দূর থেকে দেখেই বুঝছি, আমি এখন যাই।
কুসুম উঠে বসে আছে।
-বুবু ভিতরে এলো না?
-আমাদের দুজনের একসাথে থাকতে বলে চলে গেল।
-দরজার পিছনের সব ফোন নাম্বার লেখা আছে, তোমার ফোনটা দাও রান্নার মেয়েটাকে একটা ফোন করে আসতে না বলে দেই। রান্না তো সব বুবুই করে নিয়ে এ�