প্রকট হচ্ছে সামাজিক অসুস্থাতার গভীর ক্ষত

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

দেশ যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের ভেতর দিয়ে সময় পার করছে। প্রতিদিন সকাল হলেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে ধর্ষণ, যৌন হেনস্তা,

2026-05-09T12:11:49+00:00
2026-05-09T12:17:44+00:00
 
  শনিবার, ৯ মে ২০২৬,
২৬ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
শনিবার, ৯ মে ২০২৬
জাতীয়
বিচারের আগেই গণবিচার
প্রকট হচ্ছে সামাজিক অসুস্থাতার গভীর ক্ষত
শাকিল আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১২:১১ পিএম  আপডেট: ০৯.০৫.২০২৬ ১২:১৭ পিএম

দেশ যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কের ভেতর দিয়ে সময় পার করছে। প্রতিদিন সকাল হলেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে ধর্ষণ, যৌন হেনস্তা, শিশু নির্যাতন কিংবা গণপিটুনিতে মৃত্যুর খবর। কোথাও মাদ্রাসাছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, কোথাও শিশুর সামনে মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আবার কোথাও ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তের স্বজনদের পিটিয়ে হত্যা করছে উত্তেজিত জনতা। একের পর এক এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাই নয়, সমাজের গভীরে জমে থাকা ভয়াবহ অসুস্থতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) কয়েকটি ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেও প্রশ্ন উঠছে, কেন থামছে না এই অপরাধ? কেন দিন দিন আরও নির্মম হয়ে উঠছে ধর্ষণ ও সহিংসতার ধরন?

নেত্রকোনার মদনে ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১৪। পরিবার জানায়, শিশুটির মা জীবিকার তাগিদে অন্য জেলায় কাজ করতেন। সেই সুযোগেই দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয় শিশুটি। অন্যদিকে ময়মনসিংহের নান্দাইলে পথ হারানো এক নারীকে তিন বছরের শিশুকন্যার সামনে রাতভর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে দুই বছরের শিশুসন্তানের সামনে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায়ও অভিযুক্তকে রাজধানী থেকে আটক করা হয়। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। তবে সেই ক্ষোভ অনেক সময় ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। মানিকগঞ্জে সাত বছরের শিশু আতিকাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরের নাম প্রকাশের পর তার বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা। 

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে অপরাধীর বিচার হবে, তখনই ‘মব জাস্টিস’ সমাজে জায়গা করে নেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্ষোভ, হতাশা ও বিচারহীনতার অভিযোগে ভরে উঠছে মন্তব্যের ঘর। অনেকেই বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা এত বেশি হচ্ছে যে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ কঠোর শাস্তি ও দ্রুত বিচারের দাবি তুলছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জনরোষ বা আবেগ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, চলতি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশে ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ৫৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ১২৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মার্চ মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬১ জন। এর মধ্যে ছয় বছরের নিচে কয়েকজন শিশুও রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) বলছে, শুধু জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেই শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্তত ৭১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও ভয়াবহ। কারণ বহু পরিবার সামাজিক লজ্জা, হুমকি কিংবা পুলিশের অসহযোগিতার কারণে মামলা করে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিরা রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে চুপ করিয়ে দেয়। ফলে অধিকাংশ ঘটনাই অন্ধকারে থেকে যায়।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ মনে করেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তের দুর্বলতা অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। তার ভাষায়, ধর্ষণের মামলা আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তার বদলি কিংবা চিকিৎসা প্রতিবেদনের বিলম্বে অনেক মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা খালাস পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, মাদক, অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহার, সহিংস পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক শিক্ষার অভাব তরুণদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যেও। সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় এক মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি ও জবাবদিহির অভাব শিশুদের ঝুঁকিতে ফেলছে। 

বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী অবশ্য দাবি করেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সমাজের একটি অংশ মনে করে, শুধু বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; প্রয়োজন বাস্তব ও কার্যকর মনিটরিং।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মানসিক সংকটও। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন ও সামাজিক মেরুকরণ মানুষের সহনশীলতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ছোট ঘটনা থেকেও দ্রুত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতন ঠেকাতে শুধু আইন নয়, সামাজিক আন্দোলন, শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও কমিউনিটি নজরদারির ওপর জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সেই সমন্বিত উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। এখানে বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই কয়েকদিন আলোচনা হয়, তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন বড় ভূমিকা রাখছে। কোনো ঘটনা ঘটার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে জনরোষ তৈরি করছে। কখনো কখনো গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যও উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষকরাও বলছেন, অনলাইন ঘৃণাবাদ, সহিংস ভাষা ও উসকানিমূলক কনটেন্ট সামাজিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। 

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু আসামি গ্রেপ্তার করে এই সংকট থামানো যাবে না। প্রয়োজন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, তদন্তব্যবস্থা আধুনিক করা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও ‘মব জাস্টিস’-এর এই ভয়ংকর চক্র সমাজকে আরও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে, এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ধর্ষণ, নারী হেনস্তা ও ‘মব জাস্টিস’-এর মতো ভয়াবহ অপরাধ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। 
তিনি বলেন, ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে জঘন্য আঘাত। একজন ধর্ষকের কোনো ধর্ম, দল বা পরিচয় থাকতে পারে না, অপরাধী হিসেবে তাকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।

তিনি আরও বলেন, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে নারী ও শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে চলাফেরা করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: