জাতীয় সংসদকে বিরোধী রাজনীতির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটি শুধু সংসদীয় বিতর্ক, নোটিশ বা ওয়াকআউটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো ইস্যু সামনে রেখে রাজপথেও সরকারবিরোধী চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তারা। লক্ষ্য হলো—সংসদ ও মাঠ—দুই জায়গা থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। ধর্ষণ, খুন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, আধিপত্য ও চাঁদাবাজির মতো বিষয়ও তাদের আন্দোলনের এজেন্ডায় গুরুত্ব পাবে।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন কৌশলগত পরিকল্পনার তথ্য জানা গেছে।
জামায়াতের অভিযোগ, বিএনপি সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিষয়টি সংসদ ও মাঠ—উভয় জায়গায় জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায় দলটি। অতীতের মতো শুধু সংসদ বর্জন বা প্রতীকী প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদীয় বিতর্ক, ওয়াকআউট এবং রাজপথের আন্দোলন একসঙ্গে চালানোর নীতি নিয়েছে তারা।
জামায়াত দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে। একই সঙ্গে দলীয় প্রশাসকদের বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন এবং তাঁদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি। জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনও তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। তাঁর ভাষায়, বর্তমান দলীয় প্রশাসকেরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মূল সূত্রপাত গণভোটকে ঘিরে। সংবিধান–সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়লেও বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির তিন নেতা জানিয়েছেন, সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজেদের ভূমিকা, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নিয়মিত অনানুষ্ঠানিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সেই আলোচনায় সংসদকে রাজনীতির মূল কেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, বিরোধী দল হিসেবে সংসদে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বক্তব্য দেওয়া এবং সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সক্রিয় থেকেছেন জামায়াতের সদস্যরা। যদিও দলটির কিছু নেতা মনে করেন, সরকারকে আরও কার্যকরভাবে চাপে রাখতে তাঁদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব তিনটি—সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা ও সংশোধনের দাবি জানানো, আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তাঁর দাবি, এই তিন ক্ষেত্রেই বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। সংসদীয় রীতিতে ওয়াকআউট বড় ধরনের প্রতিবাদ, এবং বিভিন্ন ইস্যুতে দলটি তা করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি ও সংস্কার–সংশ্লিষ্ট কিছু অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে জামায়াত যৌক্তিকভাবেই ওয়াকআউট করেছে। তাঁর মতে, দলটির লক্ষ্য সংসদকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। অতীতের বিরোধী দলগুলোর মতো শুধু সংসদ বর্জন নয়, বরং সংসদের ভেতরে সমালোচনা এবং রাজপথে আন্দোলন—দুই ধারাই একসঙ্গে চালাবে জামায়াত।
দলটির নেতারা জানিয়েছেন, সংসদে সংস্কার–সংক্রান্ত বিষয়ে সমাধান না এলে দাবি আদায়ে মাঠের আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াত, এনসিপিসহ ১১–দলীয় জোট ইতোমধ্যে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গত ৩০ এপ্রিল তারা কয়েক মাসব্যাপী কর্মসূচি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় সমাবেশ—১৬ মে রাজশাহী, ১৩ জুন চট্টগ্রাম, ২০ জুন খুলনা, ২৭ জুন ময়মনসিংহ, ১১ জুলাই রংপুর, ১৮ জুলাই বরিশাল এবং ২৫ জুলাই সিলেট। এসব সমাবেশে বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হবে। সবশেষে আগামী অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১১–দলীয় জোটের কর্মসূচির বাইরে দলগুলো নিজ নিজ ব্যানারেও মতবিনিময় সভা, সেমিনার, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করবে বলে জানিয়েছেন হামিদুর রহমান আযাদ।