দীর্ঘ দুই দশক ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। এই সময়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও কারাবরনসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারুণ্যের এক বিশাল অংশ এখন কেবল স্লোগানসর্বস্ব নেতৃত্ব নয় বরং শিক্ষার্থী বান্ধব, মেধাভিত্তিক ও সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চাতে বিশ্বাস করে। তারুণ্যের চাহিদা আর আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছাত্রদলের কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি।
ছাত্রদল সূত্রে জানা যায়, বর্তমান কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ পূর্ণ হয়েছে। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক বছরের মেয়াদী কমিটির সময়সীমাও উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংগঠনটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে উপদেষ্টারা স্পষ্টভাবেই মত দেন, নির্বাচন পরবর্তী দলকে শক্তিশালী ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলের তরুণ চালিকাশক্তি ছাত্রদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে।
২০২৪ সালের পহেলা মার্চ ৭ সদস্যের আংশিক কমিটি অনুমোদনের পর একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। এই কমিটিতে ছাত্রদলের শীর্ষ দুই নেতার পছন্দের লোকজনদের স্থান দিতে গিয়ে রাজপথের পরীক্ষিত ও মামলায় জর্জরিত শতাধিক যোগ্য প্রার্থীর স্থান হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে 'মাইম্যান' স্থান দেওয়া ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ফল ভরাডুবি হয় বলেও জানান ছাত্রদলের তৃণমূলের কর্মীরা। এসব কারনে সমালোচনার মুখে পরতে হয়েছে বর্তমান নেতৃত্বকে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই অর্থাৎ ঈদের পরপর ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। ছাত্রদলকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই বিএনপির সামগ্রিক সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত হবে। এবারের কমিটি গঠনে তারেক রহমান সরাসরি নজরদারি করছেন। যারা বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, বারবার হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, সারাদেশে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং মেধাভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ -তারাই আগামীর নেতৃত্বে অগ্রাধিকার পাবেন। তবে ছাত্রদলের সর্বোচ্চ অভিভাবক তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে কারা ছাত্রদলের আগামীর হাল ধরবেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে শীর্ষ পদে আসার জন্য ইতোমধ্যে এক ডজন নেতা জোরালোভাবে দৌড়ঝাপ শুরু করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ও দলীয় কর্মসূচি পালন করে নিজেদেরকে জানান দিচ্ছেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আড্ডা-ইফতার-শোডাউনসহ নানা সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়াচ্ছেন, কর্মীদের নিয়মিত সময় দিচ্ছেন।
শীর্ষ পদে আলোচনায় যারা:
ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ডজনখানেক প্রার্থীর মধ্যে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ মনজুরুল আলম রিয়াদ, সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সহ সভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামিম আকতার শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, ঢাবির সহ সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক। এছাড়া বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরও সভাপতি হওয়ার জন্য লবিং করছেন।
দুই দফায় ১৪৮ দিন কারাভোগ করেছেন কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি মোঃ মনজুরুল আলম রিয়াদ। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। তিনি ভোরের ডাককে বলেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা গনতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। আমার সাথে ঢাকার সকল ইউনিটের নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে। রিয়াদ বলেন, আওয়ামী লীগের ১৭ বছর ছাত্ররাজনীতিতে যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে মব কালচার তৈরি হয়েছে, এসব কিছুর অবসান ঘটিয়ে আমি পলিসিভিত্তিক ইতিবাচক রাজনীতির কালচার তৈরি করতে চাই।
সহ সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েলের রয়েছে ঈর্ষনীয় একাডেমিক ফলাফল। অনার্সে ৩.৬২ ও মাস্টার্সে ৩.৭৮ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। ৮ মামলায় তিনবার কারাবরণ করা এই ছাত্রনেতাও সংগঠনের দুর্দিনে বারবার নিজের সাহসের প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল। আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচন বানচালসহ নানা অভিযোগে ৭ মামলার আসামি হন। ৪ বার কারাবরনে একাধিকবার রিমান্ডে থেকেছেন। নানা সামাজিক কাজ ও রমজানে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে ইফতার করিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। গনতান্ত্রিক সকল আন্দোলনে ছিলেন অগ্রভাগে।
সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে নিয়ে আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। তিনিও বিগত সময়ে রাজপথে দলের পক্ষে লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন। সদস্যসচিব হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনিও গতানুগতিক ছাত্ররাজনীতির ধারা পাল্টানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতেরও রয়েছে বিগত সময়ে কারাবাস ও নির্যাতনের ইতিহাস। এর আগে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিষ্ঠা করা বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ পদে নেতা হয়নি। জিয়া উদ্দিন বাসিত এখানকার একমাত্র প্রার্থী হওয়ায় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের রাজপথের আন্দোলন, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও নানা সামাজিক কর্মকান্ডে তিনি বিভিন্ন মহলে সুনাম কুড়িয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। ছাত্রশিবিরসহ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির নিয়মিত সমালোচনা করেন। দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস ও সনাতন ধর্মালম্বী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আলোচনায় রয়েছেন।
সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ছিলেন। সেই নির্বাচনে অনিয়মের নানা অভিযোগ তুলে নিয়মিত প্রতিবাদ করেন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ২৮ অক্টোবরের বিএনপির মহাসমাবেশের পরে গুমের শিকার হয়েছেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব নির্ধারণেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের সাযে যে সবচেয়ে বেশি কানেক্টেড তাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে জানা যায়।
সম্ভাব্য নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছেন ইমাম আল নাসের মিশুক, বিএম কাউসার, সাইফ খান, শেখ তানভীর বারী হামিম, আবিদুল ইসলাম খান ও মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামীর নাম শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত এবং প্রকৃত ছাত্রদের দিয়েই কমিটি করা হবে। বিএনপির হাইকমান্ড যেকোনো সময় নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে ঠিক কবে নতুন কমিটি হবে তা তিনি বলেননি।