বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অন্যতম সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১ মার্চ। এর পর থেকেই সংগঠনটির নতুন কমিটি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়েছে। এদিকে সম্প্রতি বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলও সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কমিটি নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে বলে জানিয়েছেন।
বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার কাজ শুরু হয়েছে। ঈদের পরে যে কোনোদিন নতুন কমিটি ঘোষণা হবে। এরই প্রেক্ষিতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে হাইকমান্ডের নজরে আসতে যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ইফতারসহ সামাজিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকেই তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।
শীর্ষ পদে আলোচনায় যারা
সাধারণত ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা দেওয়ার সময় সুপার ফাইভ কমিটি দেওয়া হয়। এবার ছাত্রদলের সুপার ফাইভে ডজনখানেক নেতার নাম ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্য থেকে কয়েকজনের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র মতে, ছাত্রদল নেতাদের বয়সের বিষয়টিকে মাথায় রেখে এবার অপেক্ষাকৃত তরুণদের নেতৃত্বেই কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০০৯-১০ সেশন থেকে ২০১২-১৩ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রদল নেতাদের শীর্ষ পদে রেখে নতুন কমিটি ঘোষণা করার পরিকল্পনা চলছে। কেন্দ্রীয় কমিটি এই সেশনগুলোর মধ্য থেকে ঘোষিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিগুলো রানিং স্টুডেন্টদের দিয়েই ঘোষিত হবে বলে জানা গেছে।
বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদগুলোতে ২০০৯-১০ সেশন থেকে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আলোচনায় আছে।
২০১০-১১ সেশন থেকে আলোচনায় আছে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র সাহস, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, মাসুম বিল্লাহ ও তরিকুল ইসলাম তারিক প্রমুখ।
আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ছিলেন। সেই নির্বাচনে সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদী মুখও তিনিই ছিলেন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার রোশানলে পরে গুমের শিকার হওয়ার পাশাপাশি তিনবার কারাবরণ করেন, এছাড়াও দুই বার ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় অনিককে। গুম হওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে তার সন্ধান চাওয়া হলে এবং সারাদেশের ছাত্রদলের আন্দোলনের পর প্রকাশ্যে এনে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিলো। একজন কর্মী বান্ধব ব্যাক্তিত্বের পাশাপাশি ক্ষুরধার বক্তব্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে শিক্ষার্থীদর মধ্যে।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে এবার বেশি আলোচনায় আছে ২০১১-১২ সেশনে ভর্তি হওয়া ছাত্রদল নেতারা। এদের মধ্যে ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম রনি, মো. রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, তারেক হাসান মামুন প্রমুখ। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে গিয়ে একাধিকবার ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছে। এছাড়া চব্বিশের আন্দোলনেও নাছির উদ্দিন শাওনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। সাম্প্রতিক সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বাইরে সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে শীর্ষ পদের দাবিদার হিসেবে ভালো অবস্থানে আছে। এই সেশনের আরেকজন শক্তিশালী প্রার্থী আব্দুর রহিম রনিও আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন এবং কারাবন্দি থাকা অবস্থায় বাবার জানাজায়ও অংশ নিতে পারেনি।
এদিকে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের দিয়ে কমিটি ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা রাখায় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদে ২০১২-১৩ সেশনে ভর্তি হওয়া ছাত্রদল নেতারাও চলে আসতে পারে। ২০১২-১৩ সেশনের মধ্যে যারা আলোচনায় আছে তারা হচ্ছেন- ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, যোগাযোগ সম্পাদক আরিফ হাসান, ঢাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম ভূইয়া ইমন, সহ সভাপতি সৈকত মোরশেদ প্রমূখ। কেন্দ্রীয় কমিটির পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন এবং ছাত্রলীগের হামলার মুখে সাহসী ভূমিকা রেখে আলোচনায় আসেন। আর নুর আলম ভূইয়া ইমন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আশা, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, ত্যাগী এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ তরুণ নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও নতুন প্রজন্মের ভাবনা বোঝার সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
ছাত্রদলের নতুন কমিটির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা। তাদের মতে, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।