কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মোকাবেলায় হতে হবে কৌশলী

সোহাগ রাসিফ

রাজনীতি

আওয়ামী লীগ বিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির বিজয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করেছে। দীর্ঘ

2026-02-16T12:08:51+00:00
2026-02-16T12:28:22+00:00
 
  শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
রাজনীতি
কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মোকাবেলায় হতে হবে কৌশলী
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার
সোহাগ রাসিফ
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম  আপডেট: ১৬.০২.২০২৬ ১২:২৮ পিএম
আওয়ামী লীগ বিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির বিজয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করেছে। দীর্ঘ ২ দশক পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাচ্ছে বিএনপি এবং সরকার প্রধান হচ্ছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামীকাল মঙ্গলবার শপথ নিতে যাওয়া নতুন সরকারের জন্য সামনের পথচলা কেবল পুষ্পশয্যা নয়, বরং জমে থাকা বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রেসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা। বিশ্লেষকরা বলেছেন, জনআকাঙ্খা পূরণ, অর্থনৈতিক চাপ সামলানো ও কূটনীতিক সম্পর্ক জোরদারে নতুন সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিএনপির একাধিক র্শীর্ষ নেতা বলেছেন, বহুবার দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে বিএনপির। রাষ্ট্রের অচলাবস্থা থাকলেও তারেক রহমানের নেতৃত্বে আস্তে আস্তে ওভারকাম করা সম্ভব হবে। সরকার গঠন হলে তারা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ শুরু করবে, যাতে করে উভয়পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হয়।   

কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন:  দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কিছু দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে ইতোপূর্বে সমালোচনা হয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের রাজনীতির পঠ পরিবর্তনে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসলেও দেড় বছরে পররাষ্ট্রনীতি সুসংহত রূপ পায়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি অবনতি দেখা গেছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ন।

নতুন সরকারের সামনে অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান ‘মরচে ধরা’ সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো। গত কয়েক বছরে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোন করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি সম্পর্ক জোরদারে ইতিবাচক বার্তার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী অনিশ্চয়তা বা ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ আচরণ সামলানো হবে আরেকটি বড় কাজ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত রীতিনীতি উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা থাকায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিশ্বজুড়ে এখন ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ বা নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘লেনদেননির্ভর’ কূটনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে, এমন অবস্থায় বাংলাদেশের নতুন সরকার নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান বুঝে পা ফেলতে হবে। শুধু ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং চীন, রাশিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর সঙ্গেও সমতা ও অসাম্প্রদায়িক কৌশলে সম্পর্কের নতুন গতি সঞ্চার করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, নতুন সরকারের জন্য শুধু ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত ফোকাস করা উচিত নয়। এগুলো অনিবার্য বাস্তবতা, তাই কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানে ভারতের সব কথা মানা নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে।

দূর্বল অর্থনীতি চাঙ্গা করা: নতুন সরকারকে এমন এক অর্থনীতি সামলাতে হবে যা বর্তমানে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন অর্থনীতির প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জ। ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্যমতে, দেশে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.৮৯ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছে।

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রপ্তানি খাতও বর্তমানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় ৪.৪১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৫ শতাংশ কম। এছাড়া ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (চঞঅ/ঋঞঅ) সম্পাদনের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ও আকাশছোঁয়া খেলাপি ঋণ, যা বর্তমানে প্রায় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ নতুন সরকারের জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্র সংস্কারের চাপ: অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে ‘মব সন্ত্রাস’ বা গণপিটুনির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা নাগরিক মনে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনের সকল স্তরে ‘চেইন-অব-কমান্ড’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন সরকারের প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ।

পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর মতে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি একটি জটিল ইস্যুতে রূপ নিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য প্রয়োজন হতে পারে, অন্যথায় সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যায়। এছাড়া নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো টেকসই সাংবিধানিক সংস্কার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানো।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে আগামীর পথরেখা : গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি-র তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন হবে সরকারের জন্য বড় অগ্রাধিকার। বিশ্লেষকরা মনে করেন, একক কোনো ব্যক্তি বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ এবং যোগ্য মানুষকে তাদের দক্ষতার জায়গায় নিয়োগ দেওয়াই হবে সংকট উত্তরণের সঠিক পথ।

সার্বিকভাবে, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিতে যাওয়া এই সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে তাদের সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার ওপর। ভারতের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সতর্ক কূটনীতি এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমেই কেবল এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।


Loading...
Loading...

রাজনীতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: