গেলো বছরের ৫ আগষ্ট ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাহারায় আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় নেন ভারত। ৫ আগষ্ট পর থেকেই নানা ইস্যুতে দুরত্ব বাড়ে বাংলাদেশ -ভারত সম্পর্কে। দিন যত গেছে, দুরত্ব তত বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, দুই দেশেরই দুতাবাসের পাশপাশে বিক্ষোভ করার চেষ্টা করে স্ব স্ব দেশের নাগরিকরা। এছাড়া সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ করে। পাল্টাপাল্টি তলব করা হয় রাষ্ট্রদূতদের। সব মিলিয়ে বাড়তে থাকে ঢাকা-দিল্লীর মধ্যে উত্তেজনা ।
তবে বিএনপি চেয়ারর্পাসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর পরই শোক জানিয়ে বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকায় ছুটে এসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন নরেন্দ্র মোদির শোক বার্তা। শুধু তাই নয়, বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশের হাইকমিশনে গিয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভারতের আরেক প্রভাবশালী নেতা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং। শুধু ক্ষমতাসীন বিজেপির সরকারের মন্ত্রীরা নয়, বিরোধী দল কংগ্রেস নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধিও শোক জানান বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে। বাদ যাননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার প্রয়াণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার শোক প্রকাশ, পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ঢাকায় ছুঠে আসা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সর্ম্পক উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার অতুলনীয় ভুমিকার কথা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সর্ম্পকে নয়া মেরুকরণ সৃষ্টি হচ্ছে। পেছনে আগামী দিনে দুই দেশের সর্ম্পক উন্নয়ন বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সর্ম্পক যে ইতিবাচক দিকে মোড় নিয়েছে , তা প্রমাণ করে ।
যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখার কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। একইসঙ্গে জয়শঙ্করের সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন কমবে কি না, তার উত্তর আগামীতে খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
গতকাল বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারর্পাসন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া চিঠি হস্তান্তর করেন। তারেক রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে বিএনপি তার মায়ের আদর্শগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি লিখেন, এই আদর্শগুলো ভারত ও বাংলাদেশের নতুন পথচলা নিশ্চিতে ও ঐতিহাসিক অংশীদারিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে ‘আলোকবর্তিকা’ হিসেবে কাজ করবে। চিঠিতে খালেদা জিয়ার বিদায়ে তৈরি হওয়া ‘অপূরণীয় ব্যক্তিগত ও জাতীয় শূন্যতার কথা উল্লেখ করে তার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন নরেন্দ্র মোদি।
২০১৫ সালের জুন মাসে ঢাকায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলোচনার আন্তরিকভাবে স্মরণ করার কথা উল্লেখ করে মোদি লিখেছেন, তিনি ছিলেন সংকল্প ও আদর্শনিষ্ঠায় বিরল এক নেত্রী, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
চিঠিতে তারেক রহমানের প্রতি মোদি বলেন, আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আপনার যোগ্য নেতৃত্বে তার সেই আদর্শগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। একইসঙ্গে তা এক নতুন পথচলা নিশ্চিত করতে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করতে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
এদিকে আজ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানিয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদারে বেগম খালেদা জিয়ার উল্লেখযোগ্য অবদান সবসময় স্মরণ করা হবে। আজ দুপুরে দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ সময় তিনি বাংলাদেশ মিশনে সংরক্ষিত শোক বইতে একটি বার্তা লেখেন।
শোকবার্তায় রাজনাথ সিং লিখেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে ভারতের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান সবসময় স্মরণ করা হবে।
এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এই শোক জানান তিনি। পোস্টে তিনি লেখেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশের পথচলায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। খালেদা জিয়ার পরিবার, সমর্থক ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মমতা এই শোক জানান। বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা পোস্টটিতে মমতা লিখেছেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা অন্যতম জননেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আমি শোকাহত। আমি তার শোকসন্তপ্ত পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের আমার সমবেদনা জানাচ্ছি।