পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার জল, নদীর বুকে সাদা পাথরের মায়াবী দৃশ্য, সবুজ চা-বাগানের ঢেউ আর স্বচ্ছ জলধারার অপার সৌন্দর্য—প্রকৃতির এই অপরূপ আহ্বানে সাড়া দিয়ে পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে সিলেট। দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। কারও চোখে পাহাড় দেখার স্বপ্ন, কারও আকর্ষণ নদী-ঝরনা, আবার কেউ খুঁজছেন সবুজের স্নিগ্ধতায় কিছুটা নির্ভার সময়।
পর্যটকদের আগমনে সিলেটের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তাঁদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস ও রিসোর্টগুলোও। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৫০০ হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ ইতিমধ্যে বুকিং হয়েছে। ছুটির এই সময়ে পর্যটন খাতে অন্তত ৫০ কোটি টাকার ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল থেকেই জাফলং, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, রাতারগুল ও লালাখালসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। কোথাও পাহাড় আর মেঘের মিতালি, কোথাও নদীর স্বচ্ছ জল আর পাথরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য—প্রকৃতির বিচিত্র রূপ উপভোগে ব্যস্ত পর্যটকেরা। নগরের ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেকে।
সরকারি অফিস-আদালতের ছুটি শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে পর্যটকদের ভিড় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কয়েকটি দিন প্রকৃতির কাছে কাটানোর এই সুযোগকে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বেড়েছে প্রত্যাশা।
নগরের জিন্দাবাজার এলাকার হোটেল গোল্ডেন সিটির ব্যবস্থাপক মিষ্টু দত্ত বলেন, পর্যটকদের স্বাগত জানাতে তাঁদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ইতিমধ্যে হোটেলের প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। ছুটির বাকি দিনগুলোতে আরও কক্ষ বুকিং হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
সিলেট হোটেল মোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী জুয়েল বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সিলেটে কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এতে পর্যটন খাতে ভালো ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, পর্যটকদের আগমনে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয় বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
তবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের এই আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে পর্যটকদের নিরাপত্তায়ও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন ও পুলিশ। ভ্রমণপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ রানা জানান, পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান বলেন, হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ছুটির এই কদিন সিলেট যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলা—পাহাড়, নদী, ঝরনা আর সবুজের টানে মানুষ ছুটে আসছেন এক টুকরো প্রশান্তির খোঁজে। পর্যটকদের এই আগমন শুধু সিলেটের সৌন্দর্যকে নতুন করে তুলে ধরছে না, একই সঙ্গে চাঙা করছে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা ও অর্থনীতিকেও।